নিজস্ব প্রতিনিধি :আজ ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ বুধবার; বিকাল ৩:০০টায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে “বিশ্ব মানবাধিকার দিবস-২০২৫” উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে সমাবেশ ও সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে ঘোষণা পাঠ করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি। ঘোষণা পাঠ শেষে সংঙ্গীত পরিবেশন করেন মাহমুদুল হাসান ও তার দল; আদিবাসী নৃত্য পরিবেশন করেন মুক্তা ঠাকুর ও তার দল; পাহাড়ী নৃত্য পরিবেশন করেন কালারস্ ওফ হিল ; একক পরিবেশন করেন নৃত্য ইপ্সিতা মহোত্তম; করিওগ্রাফি পরিবেশন কারিশমা সাংস্কৃতিক দল। কবিতা আবৃত্তি করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আইটি কো-অর্ডিনেটর দোলন কৃষ্ণ শীল; সমবেত কবিতা আবৃত্তি করেন স্বরব্যাঞ্জন (সুপ্রভা সেবতি ও তার দল)
স্বাগত বক্তব্যে সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন,১৯৯৩ এর ভিয়েনা মানবাধিকার সম্মেলনে নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে নারী সমাজের উচ্চ কণ্ঠস্বর ছিলো নারীর অধিকার মানবাধিকার এর প্রতি এবং নারী নির্যাতন মানবাধিকার লংঘন এর বিরুদ্ধে,এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আমরা উপলব্ধি করতে পারি সার্বজনীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা হলেই নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা হয়না, নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সেখানে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, মর্যাদা, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার, বৈষম্যহীনতা, শোভন কাজের অধিকার, সমান কাজে সমান মজুরির অধিকার, তৃতীয় লিঙ্গ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারীদের উন্নয়নের অধিকার, সংখ্যালঘুদের সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত থাকার অধিকার, সম্পদ-সম্পত্তিতে সমান অধিকার সহ রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার সবই মানবাধিকারের অর্ন্তভূক্ত। নারীর জীবনের একটি দিকের সাথে আরেকটি দিক মানবাধিকারের সাথে সম্পর্কিত। বিশ^জুড়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় বাধা নারীর প্রতি সহিংসতা। এই সহিংতা প্রতিরোধের আন্দোলন নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম অনুসঙ্গ। তাই আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষের সাথে বিশ^ মানবাধিকার দিবসের সাথে একাত্ম হয়েছে আজ। একইভাবে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সকল পর্যায়ের, সকল শ্রেণীর ও সকল মর্যাদার নারীকে নিয়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন কে চালিয়ে যেতে হবে। আজ বিভিন্নভাবে নারীর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটছে। এদেশে নারীর মানবাধিকার রক্ষায়, নারী মুক্তির জন্য রোকেয়া আজ থেকে দেড়শো বছর আগে যে নারীমুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তাকে নিয়ে আজ নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, যা কোনভাবেই কাম্য নয়, রাষ্ট্র এখানে কি পদক্ষেপ গ্রহন করবে বিষয়টি আজ আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে। নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে অগ্রসর করতে যেয়ে যারা নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বাধা তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে সকলের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, মানবাধিকার আমাদের নিত্যদিনের অপরিহার্য। মানবাধিকার আমাদের জীবনের ভিত্তি, একে সাথে করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। মানবাধিকারের মূল বিষয়- সমতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার- যা প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান জনগণ, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দলকে দায়িত্ব দিয়েছে। মানবাধিকার কমিশনের সংশোধিত অধ্যাদেশে নারীর সম্পর্কিত কোন ইস্যূ নেই। আজকে নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলা হয়। নারীর জীবনের সবচেয়ে সংকট নির্যাতন ও সহিংসতা। এই সহিংসতা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের ভ’মিকা জোরালো এমনটি বলা যাবেনা। শুধুমাত্র মন্ত্রনালয়ের নাম পরিবর্তন না করে নারী আন্দোলনের যে দাবি- নারীর নির্যাতন না বলুন, সম্পদ- সম্পত্তিতে সমঅধিকার এবং সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন-এই সকল বিষয়ে সরকারকে কার্যকর পদেেক্ষপ গ্রহণের জোরালো আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে ঘোষণা পাঠ করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি । তিনি বলেন বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো-পদ্ধতিমূলত রীতি-নীতি-প্রথা পুরুষ আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত এবং নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় নারীর অবস্থান এই সমাজে পুরুষের অধীন। শুধুমাত্র লিঙ্গীয় পরিচয়ের কারণে ধর্ষণ,যৌন নির্যাতন,পারিবারিক সহিংসতাসহ বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হতে হয় এই নারীদের। এভাবে লঙ্ঘিত হয় নারীর মানবাধিকার। নারী সমাজ ছাড়াও আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, দলিতসহ সকল ধরণের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা সবসময়ই ঘটে চলেছে। ঠিক এইরকম একটি পরিবেশে ও সময়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দেশে সকল নাগরিকের সংবিধানস্বীকৃত মানবাধিকার সমুন্নত রাখার দাবিতে সমাবেশ থেকে
১. নারীর অধিকার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামাজিক আন্দোলন শক্তিশালী করার আহব্বান জানাচেছ।
২. নারী, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, দলিতসহ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছে।
৩. সাইবার সহিংসতাসহ সকল প্রকার নারী নির্যাতন এবং নারী প্রতি সহিংসতার দ্রুততম সময়ে সুষ্ঠু বিচার দাবি করছে।
৪. এই সমাবেশ ঘৃণা-বিদ্বেষ আর বিভাজনের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।
৫. এই সমাবেশ সকল প্রকার বৈষম্য-অসমতা আর সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য তরুণ সমাজের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।
৬. সমাজে মানুষের মধ্যে পাস্পরিক সম্প্রীতি, সহমর্মিতা, ধৈর্য্য, সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার মানুষের অধিকার আদায়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাচ্ছে।
৭. নারীর মানবাধিকারসহ দেশের সকল নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষার জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করে স্বাধীন, শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের জোর দাবি জানাচ্ছে।
৮. এই সমাবেশ অবিলম্বে ‘‘বৈষম্য বিরোধী আইন’’ প্রণয়ন ও বাস্তাবায়নের দাবী জানাচ্ছে।
৯. এই সমাবেশ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ দলিল সিডও সনদের ২ নং এবং ১৬-১(গ) ধারা থেকে সংরক্ষণ তুলে নিয়ে পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করার দাবী জানাচ্ছে।
উক্ত সমাবেশ ও সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সংগঠনের মধ্যে ব্লাষ্ট, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র এর প্রতিনিধিবৃন্দ সহ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেত্রীবৃন্দ, সম্পাদকমন্ডলী, কর্মকর্তাগণ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ প্রায় ২০০ এর অধিক উপস্থিত ছিলেন। সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা ও এডভোকেসি এন্ড নেটওয়ার্কিং পরিচালক জনা গোস্বামী।


