রুপসীবাংলা৭১ আন্তর্জাতিক ডেস্ক: স্নায়ুবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক অপটোজেনেটিকস গবেষণার জন্য মার্কিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও স্নায়ুবিজ্ঞানী কার্ল ডেইসেরথ এবং জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান ও জর্জ নাগেলকে সোমবার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।অপটোজেনেটিক্সের মাধ্যমে আলো ব্যবহার করে স্নায়ুর সংকেত নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এর সাহায্যে গবেষকরা বুঝতে পারেন, নির্দিষ্ট ধরনের কোষ শেখা, ভয়, আসক্তি ও চলাফেরার মতো আচরণে কীভাবে ভূমিকা রাখে।
স্টকহোম থেকে এএফপি জানায়, নোবেল অ্যাসেম্বলি বলেছে, ‘স্নায়ুকোষের জন্য একটি আণবিক সুইচ আবিষ্কারের জন্য’ এই তিন বিজ্ঞানীকে সম্মানিত করা হয়েছে। নোবেল ফাউন্ডেশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডেইসেরথ বলেন, ‘এটি অবিশ্বাস্য সম্মান এবং অপ্রত্যাশিতও বটে। তবে আমি গভীরভাবে সম্মানিত বোধ করছি।’ তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করার পর তিনি ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক পরপরই স্টকহোম থেকে ফোনটি আসে। তিনি বলেন, ‘এখন মনে হচ্ছে বেশ কিছু সময়ের জন্য আমি আর ঘুমাতে পারব না।’
আলো ব্যবহার করে গবেষকরা এখন মস্তিষ্কের পৃথক স্নায়বিক সার্কিট চালু বা বন্ধ করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে তারা নির্দিষ্ট স্মৃতি, অনুভূতি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়বিক সার্কিট শনাক্ত করতে পেরেছেন, যা বিভিন্ন স্নায়বিক ও মানসিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত।ক্লিনিক্যাল চিকিৎসায় মানুষের ওপর এই পদ্ধতি এখনো অত্যন্ত সীমিত পরিসরে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট ধরনের অন্ধত্বের চিকিৎসায় এটি প্রয়োগ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি পারকিনসন রোগ ও মৃগীরোগের মতো সমস্যার চিকিৎসায় ভূমিকা রাখতে পারে।
নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান পের স্ভেনিংসন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘অপটোজেনেটিকস এমনভাবে মস্তিষ্কের মানচিত্র তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যা একসময় আমরা কেবল স্বপ্নেই কল্পনা করতে পারতাম।’ জুরি বলেছে, এই ক্ষেত্রটি ‘মস্তিষ্ক সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়াকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে।’ অ্যাসেম্বলির মহাসচিব টমাস পার্লম্যান সাংবাদিকদের বলেন, তিন বিজয়ীকে পুরস্কারের খবর জানাতে তিনি টেলিফোনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে ডেইসেরথকে ফোন করি। ফোন ধরার সময় তিনি খুব ক্লান্ত ছিলেন। তিনি নিশ্চিতভাবেই ঘুমিয়ে ছিলেন, তবে ঘুম থেকে উঠে ফোন ধরেন।’ তিনি বলেন, ‘তিনজনই একই কথা বলেছেন—অন্য দুজনের সঙ্গে এই পুরস্কার পেয়ে তারা অত্যন্ত আনন্দিত।’
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের বায়োইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নিউরোটেকনোলজির অধ্যাপক সাইমন শুল্টজ এএফপিকে পাঠানো এক মন্তব্যে বলেন, ‘এটি এমন একটি নোবেল পুরস্কার, যা আমরা সবাই বেশ কিছুদিন ধরেই আসতে দেখছিলাম।’তিনি বলেন, ‘আলো ও জেনেটিকসের সমন্বয়ে কোষকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা জীববিজ্ঞানের সর্বত্র রূপান্তরমূলক প্রভাব ফেলেছে।’ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশলের ভিজিটিং অধ্যাপক কনস্টান্টিন নিকোলিক বলেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্র হবে মানুষের ওপর এর ব্যবহার।
মানুষের কোষে জিনগতভাবে অমানবিক, সাধারণত অণুজীব থেকে পাওয়া প্রোটিন প্রবেশ করানোর বিষয়ে শুরুতে নৈতিকতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ক্ষেত্রটি উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে এবং অপটোজেনেটিক পদ্ধতি ইতোমধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রবেশ করেছে।’ ডেইসেরথের বয়স ৫৪ বছর। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ৭১ বছর বয়সী হেগেমান বার্লিনের হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক। ৭৩ বছর বয়সী নাগেল উর্ৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োফিজিক্সের অধ্যাপক।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎস এক্সে দেওয়া এক মন্তব্যে বলেন, ‘এই পুরস্কার দেখিয়ে দেয় যে জার্মান গবেষণা সর্বোচ্চ মানের। বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ ২০০০-এর দশকের গোড়ার দিকে হেগেমান ও নাগেল পরীক্ষা করছিলেন, কেন একটি এককোষী শৈবাল আলোর উৎসের দিকে সাঁতার কাটতে সক্ষম। তারা শৈবালের কোষের পৃষ্ঠে একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যের প্রোটিন আবিষ্কার করেন, যার নাম চ্যানেলরোডপসিন। নীল আলো ফেললে ওই প্রোটিনের মধ্য দিয়ে একটি চ্যানেল খুলে যায়।
এরপর আধানযুক্ত আয়ন কোষের ভেতরে প্রবেশ করে এবং বৈদ্যুতিক স্পন্দন সৃষ্টি করে। তারা দেখতে পান, যে কোনো কোষে এই প্রোটিন প্রবেশ করানো হলে সেটি আলোর প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এরপর ডেইসেরথ ইঁদুরের স্নায়ুকোষে চ্যানেলরোডপসিনের জিন প্রবেশ করান। কোষগুলোর ওপর নীল আলো ফেললে তিনি স্নায়বিক সংকেত সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। তিনি ২০০৫ সালে এই যুগান্তকারী গবেষণার ফল প্রকাশ করেন এবং এর দুই বছর পর জীবিত ইঁদুরের মস্তিষ্কে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্নায়ুকোষের সুইচ কার্যকর করতে সক্ষম হন।
ডেইসেরথ একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞও। তিনি গুরুতর মানসিক ও স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করেন, যার মধ্যে রয়েছে আবেগজনিত সমস্যা ও অটিজম স্পেকট্রামজনিত অবস্থা। নোবেল ফাউন্ডেশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওই চিকিৎসাকাজ ‘নতুন দৃষ্টিভঙ্গির একটি অবিরাম উৎস এবং মানুষের জীবনে আসলে যা গুরুত্বপূর্ণ, সেই বিষয়টির সঙ্গে একটি সংযোগ’ তৈরি করে। তিনি বলেন, ‘রোগীর কাছে আসলে কী গুরুত্বপূর্ণ, তা দেখা আমাকে নিয়মিতভাবে গবেষণাগারে পরীক্ষার নকশা তৈরি করতে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে এবং মানুষের পরিবর্তিত মস্তিষ্কে আসলে কী গুরুত্বপূর্ণ, তা তুলে ধরতে সহায়তা করে।’এ বছরের নোবেল বিজয়ীরা আগামী ১০ ডিসেম্বর পুরস্কার গ্রহণ করবেন। এদিন একটি সনদ, একটি স্বর্ণপদক এবং ভাগ করে নেওয়ার জন্য ১২ লাখ ডলারের পুরস্কার পাবেন তারা। ১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর পুরস্কারের প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুর বার্ষিকী উপলক্ষে ওই দিন পুরস্কার প্রদান করা হয়।
রুপসীবাংলা৭১/এআর


