গৌতম কুমার এদবর (Gautam Kumar Edbor)
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (AI) দ্রুত বদলে দিচ্ছে সংবাদমাধ্যমের কাজের ধরন। তথ্য অনুসন্ধান, বড় নথি বিশ্লেষণ, অনুবাদ, ট্রান্সক্রিপশন, শিরোনাম তৈরিতে সহায়তা এবং ডেটা বিশ্লেষণের মতো কাজে AI ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংবাদকক্ষে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, AI ব্যবহার করে অনেক নিউজ পোর্টালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবাদ আপলোড ও আপডেট করার ব্যবস্থাও তৈরি হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই কিছু সংবাদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকাশ বা আপডেট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও বর্তমানে এ ধরনের ব্যবস্থায় ভুল তথ্য বা ভুল উপস্থাপনের ঝুঁকি রয়েছে, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যবস্থাও আরও পরিশীলিত হতে পারে।
প্রযুক্তিটির ব্যবহার যত বাড়ছে, সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—তথ্য যাচাই, নির্ভুলতা এবং সম্পাদকীয় জবাবদিহিতা—নিয়েও প্রশ্ন তত বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যে AI ব্যবহারের জন্য নিজস্ব নীতিমালা তৈরি করছে। Associated Press (AP) ২০২৬ সালে তাদের newsroom standards হালনাগাদ করে জানিয়েছে, AI গবেষণা, document summarization, transcription, translation এবং কিছু সম্পাদনামূলক কাজে সহায়তা করতে পারে। তবে AI-এর তৈরি ফলাফল প্রকাশের আগে সাংবাদিকদের তা যাচাই ও সম্পাদনা করতে হবে।
একসময় সংবাদমাধ্যমে কপি-পেস্ট সাংবাদিকতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা ছিল। AI-এর সহজলভ্যতার ফলে এখন তথ্য সংগ্রহ, পুনর্লিখন ও সম্পাদনার কাজ আরও দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে একই সঙ্গে সুযোগ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি তথ্যের মৌলিকতা, নির্ভুলতা ও উৎস যাচাইয়ের গুরুত্বও বেড়েছে।
AI-generated ছবি, ভিডিও ও অডিও: নতুন চ্যালেঞ্জ- AI-generated ছবি, ভিডিও ও অডিও সংবাদমাধ্যমের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। Reuters-এর প্রতিবেদনে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাওয়া ছবি ও ভিডিও যাচাই করতে সাংবাদিকরা উৎসের সঙ্গে যোগাযোগ, metadata, আবহাওয়া, satellite imagery এবং অন্যান্য প্রকাশ্য তথ্য মিলিয়ে দেখেন।
কিন্তু বর্তমানে AI-এর মাধ্যমে ছবি, অডিও ও ভিডিও তৈরি করা আগের তুলনায় অনেক সহজ এবং সময়সাশ্রয়ী হয়েছে। ফলে একটি বাস্তব ছবি বা ভিডিও এবং AI দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত কনটেন্টের মধ্যে পার্থক্য করা অনেক সময় কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেও বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে AI ব্যবহারের প্রেক্ষাপট- জাতীয় পর্যায়ে AI ব্যবহারের জন্য একটি দায়িত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো তৈরির উদ্যোগও চলছে। বাংলাদেশ সরকারের AI Policy উদ্যোগের ওয়েবসাইটে National Artificial Intelligence Policy 2026–2030-এর Draft V2.0 প্রকাশের তথ্য রয়েছে। একই সঙ্গে UNESCO এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনায় responsible AI, information integrity এবং data governance-এর মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের জন্যও AI ব্যবহারের একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সাংবাদিকের জায়গা কি AI নেবে?-সারা বিশ্ব এখন একটি সংযুক্ত প্ল্যাটফর্মের মতো। তথ্য ও কনটেন্ট মুহূর্তের মধ্যেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্য তৈরি হলেও এর অপব্যবহার সমাজে নানা ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
AI সাংবাদিকতার কিছু পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ দ্রুত ও সহজ করতে পারে। কিন্তু সংবাদ সংগ্রহ, উৎস যাচাই, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, প্রেক্ষাপট বোঝা এবং প্রকাশিত সংবাদের জন্য সম্পাদকীয় দায় গ্রহণ—এসব ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ।তবে এই অবস্থার পরিবর্তন কত দ্রুত হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
AI কোনো তথ্য তৈরি করলে সেটিকে সত্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং AI-এর ব্যবহার যত বাড়বে, সাংবাদিকের তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ AI অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্যও দিতে পারে।
একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা- আমি নিজে একজন সাংবাদিক হিসেবে এর একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি।একটি সরকারি কাগজে দুটি বানান ভুল আমার চোখে পড়ে। বিষয়টি আমার কৌতূহল তৈরি করে। আমার মনে হলো, সরকারি নথিতে এমন ভুল থাকার কথা নয়। তাই শব্দ দুটি সম্পর্কে জানতে আমি AI-এর সাহায্য নিই।
কিন্তু AI বারবার এমন একটি ব্যাখ্যা দিতে থাকে, যা আমার প্রশ্নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। একপর্যায়ে আমি বিরক্ত হয়ে ওই দুটি শব্দের ছবি তুলে AI-কে দিই। তখন AI ভুলটি শনাক্ত করতে সক্ষম হয় এবং আগের উত্তরের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে।এই ঘটনা আমাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে—AI যতই উন্নত হোক, একজন সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ, সন্দেহ এবং যাচাইয়ের প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি।
ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ব্যবহৃত একটি টিকিটকে ঘিরে। জমি রেজিস্ট্রি করার পর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জমির দাতাকে যে টিকিট দেওয়া হয়, সেটি পরবর্তীতে গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত সেই টিকিটে দুটি শব্দের বানান নিয়ে আমার প্রশ্ন তৈরি হয়।বাংলাদেশের ৬৪ জেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত একটি সরকারি নথির এমন বানান ভুল আমাকে ভাবিয়েছে—একজন সাংবাদিকের চোখে ধরা পড়া একটি ছোট ভুলও কীভাবে বৃহত্তর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এখানেই AI এবং সাংবাদিকতার পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। AI তথ্য বিশ্লেষণে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন তোলা, সন্দেহ করা এবং প্রয়োজন হলে তথ্যের সত্যতা যাচাই করার দায়িত্ব সাংবাদিকেরই।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের করণীয়
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে সংবাদমাধ্যমগুলোতে AI ব্যবহারের জন্য পরিষ্কার নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে। কোন কাজে AI ব্যবহার করা যাবে, কোন ক্ষেত্রে মানুষের যাচাই বাধ্যতামূলক হবে এবং AI ব্যবহারের বিষয়টি পাঠককে কীভাবে জানানো হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন।
AI ব্যবহার সহজ হলেও এর জন্য একটি নীতিমালা থাকা জরুরি। তা না হলে একসময় সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব সম্পাদকীয় স্বকীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যমের কাজকে সহজ করবে, কিন্তু সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব পরিচয় ও বিশ্বাসযোগ্যতা যেন প্রযুক্তির কাছে হারিয়ে না যায়, সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন।
প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের অনেক পুরোনো পেশাও পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় সংবাদপত্রে ছবির জন্য ফটো এজেন্সির ওপর নির্ভরতা ছিল। ফটো সাংবাদিকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সংবাদপত্রের জন্য ছবি সংগ্রহ করা। বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং AI-এর বিকাশের কারণে সেই ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
একইভাবে সংবাদপত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্টুন। একটি কার্টুনের মাধ্যমে কখনো কখনো একটি দেশের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হতো। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সংবাদপত্রের সেই ঐতিহ্যও অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়েছে। ফলে প্রযুক্তি শুধু নতুন সুযোগ তৈরি করে না, পুরোনো কিছু পেশা ও সৃজনশীল ক্ষেত্রের ওপরও প্রভাব ফেলে।
প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান- প্রযুক্তি আসবে, মানুষ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকবে—এটাই স্বাভাবিক। সংবাদমাধ্যমেও প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে। কিন্তু সেই ব্যবহারের পাশাপাশি manual verification, fact-checking এবং editorial accountability-এর জায়গাগুলো পরিষ্কার রাখা জরুরি।
নতুন প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাতেই হবে। কারণ প্রযুক্তিকে বাদ দিয়ে আধুনিক সংবাদমাধ্যম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু গণমাধ্যমের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সত্য ও সঠিক তথ্য জানানো। তাই প্রযুক্তির ব্যবহার যেন সাংবাদিকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান, বিচারবোধ এবং সম্পাদকীয় স্বকীয়তাকে প্রতিস্থাপন না করে, বরং আরও শক্তিশালী করে—এটাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।
AI সংবাদমাধ্যমের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সাংবাদিকের সহায়ক হতে পারে। তবে সেই সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষের যাচাই, দায়িত্ববোধ এবং জবাবদিহিতা।প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, শেষ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ থাকবে মানুষের আস্থা। আর সেই আস্থা ধরে রাখার দায়িত্ব সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমেরই।


