রুপসীবাংলা৭১ অন্যান্য ডেস্ক : মানুষের ইতিহাস মূলত শক্তির ইতিহাস; সেটি কখনো বাহুবলের, কখনো অস্ত্রের, আবার কখনো ক্ষমতার। সমাজে সাধারণত সেই ব্যক্তিকেই ‘বীর’ বলা হয়, যে অন্যকে পরাস্ত করতে পারে, শারীরিকভাবে শক্তিশালী কিংবা প্রতিপক্ষকে দমিয়ে রাখতে সক্ষম। হোক তা কুস্তির ময়দান কিংবা ক্ষমতার লড়াই। বিজয়ীই সেখানে বীর হিসেবে পরিচিত হয়। কিন্তু ইসলাম মানুষের এই চিরাচরিত ধারণাকে আমূল পাল্টে দিয়েছে।
ইসলাম বাহ্যিক শক্তির চেয়ে আত্মিক শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু বাইরের কেউ নয়; বরং নিজের নফস, ক্রোধ ও আবেগ। রাগের মুহূর্তে মানুষ নিজের বিবেক হারিয়ে ফেলে, সীমালঙ্ঘন করে ফেলে, সম্পর্কগুলো ভেঙে দেয়, এমনকি গুনাহেও লিপ্ত হয়।
তাই ইসলামে প্রকৃত বীরত্বের সংজ্ঞা নির্ধারিত করেছে ভেতরের শত্রুর বিরুদ্ধে জয় লাভের মাধ্যমকে।
এই সত্যটি রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ একটি হাদিসে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন; যেখানে তিনি বীরত্বের প্রচলিত ধারণাকে সংশোধন করে দিয়েছেন-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ ”.
আবূ হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সেই আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
(বুখারি, হাদিস : ৬১১৪)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ‘শিদ্দাহ’ বা শক্তি শব্দের প্রচলিত অর্থকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। আরব সমাজে কুস্তি ও শারীরিক শক্তি ছিল বীরত্বের প্রধান মাপকাঠি। মহানবী (সা.) সেই সংস্কৃতির মাঝেই দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন; প্রকৃত শক্তিমান সে নয়, যে অন্যকে মাটিতে ফেলে দিতে পারে; বরং সে-ই প্রকৃত শক্তিমান, যে নিজের রাগকে দমন করতে পারে।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, “এই হাদিসে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, রাগ দমন করা আত্মসংযমের সর্বোচ্চ স্তর। কারণ রাগ মানুষকে অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনের দিকে ঠেলে দেয়।
” (শরহু সহিহ মুসলিম)
ইবনে হাজর আল-আসকালানী (রহ.) বলেন, “রাগের সময় মানুষ যখন প্রতিশোধ নেওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা রাখে, অথচ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে সংযত রাখে—এটাই প্রকৃত বীরত্ব।” (ফাতহুল বারী)
ইমাম গাজালি (রহ.) তাঁর ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘রাগ মানুষের চারিত্রিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয় এবং শয়তান এই অবস্থাকেই সবচেয়ে বেশি কাজে লাগায়। তাই রাগ দমন করা মানে শয়তানের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করা।’
পবিত্র কোরআনুল কারিমেও এই চরিত্রের প্রশংসা করে বলা হয়েছে— “আর তারা নিজেদের ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল হয়।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৪)
এ থেকে বোঝা যায়, ইসলামে বীরত্ব মানে দাপট নয়, বরং দায়িত্বশীল সংযম; আক্রমণ নয়, বরং আত্মনিয়ন্ত্রণ; প্রতিশোধ নয়, বরং ক্ষমা। যে ব্যক্তি রাগের মুহূর্তে নিজের নফসকে পরাস্ত করতে পারে, সে-ই আল্লাহর কাছে সত্যিকার অর্থে শক্তিমান ও মর্যাদাবান।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে নববী আদর্শের আলোকে জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
রুপসীবাংলা৭১/এআর

