লেখক: সৌনক ঘোষ
ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টার, ভারতীয় হাইকমিশন,ঢাকা।
মহাত্মা গান্ধীর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জাতির এই মহান নেতার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। সত্য, অহিংসা, নিঃস্বার্থ সেবা এবং মানবিক মর্যাদার প্রতি তাঁর অবিচল অঙ্গীকার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে নতুন দিশা দিয়েছিল। একই সঙ্গে তাঁর জীবনদর্শন জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে সমগ্র মানবজাতির জন্য শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায়বিচারের এক চিরন্তন আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছে।
সম্প্রতি ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত মহাত্মা গান্ধীর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন এবং ‘সেবা পক্ষ ২০২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠিত হয়। এই স্মরণীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে মহাত্মা গান্ধীর জীবন, কর্ম ও দর্শনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি তাঁর মানবতাবাদী আদর্শের তাৎপর্য নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় বহু-ধর্মীয় প্রার্থনার মধ্য দিয়ে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদীপ প্রজ্বালন এবং মহাত্মা গান্ধীর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতিফলন ছিল পুরো আয়োজন। ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও মতাদর্শের মানুষের সম্মিলিত উপস্থিতি মহাত্মা গান্ধীর সর্বজনীন মানবতাবাদী দর্শনের গুরুত্বকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের মাননীয় হাইকমিশনার শ্রী দীনেশ ত্রিবেদী সমসাময়িক বিশ্বে মহাত্মা গান্ধীর সত্য, অহিংসা ও নিঃস্বার্থ সেবার দর্শনের প্রাসঙ্গিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, বিশ্বজুড়ে সংঘাত, অসহিষ্ণুতা ও বিভাজনের এই সময়ে গান্ধীজির আদর্শ শান্তি, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মহাত্মা গান্ধীর দর্শনের অন্যতম শক্তি হলো এর সর্বজনীনতা। তাঁর আদর্শ কেবল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, শান্তি ও অহিংস আন্দোলনের অনুপ্রেরণার উৎস। সত্যের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিরোধ এবং মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, নৈতিক শক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সাহায্যে সমাজে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও আত্মিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে সৌহার্দ্য, সাংস্কৃতিক বিনিময়, আন্তসাংস্কৃতিক সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে তাঁর মানবতাবাদী দর্শন গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে। সাংস্কৃতিক কূটনীতি ও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক সম্প্রীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি করা সম্ভব।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে মহাত্মা গান্ধীর জীবন ও দর্শন গভীর শিক্ষণীয়। বর্তমান সময়ে সামাজিক বিভাজন, অসহিষ্ণুতা এবং নানা বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় তরুণদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। গান্ধীজির জীবন আমাদের শেখায়, প্রকৃত নেতৃত্ব ক্ষমতা কিংবা প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ, নৈতিক দৃঢ়তা এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার মধ্যেই নেতৃত্বের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।
মহাত্মা গান্ধীর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন এবং ‘সেবা পক্ষ ২০২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ আমার কাছে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি ছিল না; বরং এটি ছিল মানবতা, শান্তি, সম্প্রীতি ও আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের চিরন্তন মূল্যবোধকে নতুন করে উপলব্ধি করার এক তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা।
মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শান্তি প্রতিষ্ঠার সূচনা হয় ব্যক্তির নিজের চিন্তা ও কর্ম থেকে। সত্য, অহিংসা, সহমর্মিতা এবং নিঃস্বার্থ সেবার চর্চার মধ্য দিয়েই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সম্প্রীতিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব।
মহাত্মা গান্ধীর কালজয়ী দর্শন আগামী প্রজন্মকে সত্য, শান্তি, সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পথে অনুপ্রাণিত করুক। তাঁর মানবতাবাদী আদর্শ বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যকার বন্ধুত্বকে আরও সুদৃঢ় করুক এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি ও সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করুক।


