আজাদুর রহমান বশির
ঢাকা: রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মহাখালী ও এর আশপাশের সড়কে দীর্ঘদিনের যানজট নিরসন এবং গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ট্রাফিক পুলিশ ও স্থানীয় অংশীজনদের সমন্বয়ে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৫ জুলাই এই বিশেষ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলেও এর নেপথ্যে প্রায় এক মাস আগে থেকেই ধারাবাহিক প্রস্তুতিমূলক ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়ে আসছে।
মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি ও কর্মপরিকল্পনা
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাসখানেক আগে থেকেই মহাখালী টার্মিনালকেন্দ্রিক বিশৃঙ্খলা রোধে ধারাবাহিক বৈঠক ও মাঠপর্যায়ে প্রস্তুতি শুরু হয়। মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের যানজট ও যাত্রী ভোগান্তির কারণগুলো চিহ্নিত করে একটি সুশৃঙ্খল কর্মপন্থা ঠিক করা হয়। বাস মালিক, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং ট্রাফিক পুলিশের যৌথ মতামতের ভিত্তিতে তৈরি এই বিশেষ রূপরেখা পরে বিভিন্ন কার্যক্রম ও ফেস্টুনের মাধ্যমে নগরবাসীর দৃষ্টিগোচর করা হয়।

ব্যানারের নির্দেশিকায় যা রয়েছে
টার্মিনালের সামনে ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে প্রদর্শিত ব্যানারে যানজট নিরসনে ৯টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা তুলে ধরা হয়েছে, যা বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কর্তৃপক্ষ:
ইউটার্ন ও রুট নিয়ন্ত্রণ: মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে চলাচলকারী বাসগুলো ৩০০ ফুট (পূর্বাচল) ডিপোতে যাওয়ার জন্য নির্ধারিত স্থান থেকে ইউটার্ন করবে। এছাড়া এই টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া কোনো বাসের দক্ষিণ (নাভানা) দিক দিয়ে চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সড়কে পার্কিং ও যাত্রী তোলা নিষেধ: রাস্তার পাশে কোনো অবস্থাতেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
টার্মিনালের ভেতর থেকে টিকিট: যাত্রীদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাসে না উঠে টার্মিনালের ভেতরে নির্ধারিত কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে বাসে ওঠার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নির্দিষ্ট সময়সীমা: চার ঘণ্টার মধ্যে যেসব বাসের ট্রিপ রয়েছে, কেবল সেগুলোর গাড়িই টার্মিনালে প্রবেশ করতে পারবে।
শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা: ৩০০ ফুট (পূর্বাচল) এলাকায় বাস রাখা, শ্রমিকদের বিশ্রাম এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য একটি সুব্যবস্থা করা হয়েছে।
চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত টার্মিনাল: মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালকে সম্পূর্ণ চাঁদামুক্ত, মাদকমুক্ত ও যাত্রী হয়রানি রোধ করতে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
যাত্রী ও চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি
সড়কে শৃঙ্খলা আনতে ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে চলার জন্য চালক ও যাত্রীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাসে উঠে যানজট সৃষ্টি না করার জন্য সাধারণ যাত্রীদের বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলন ও বর্তমান পরিস্থিতি
এরই ধারাবাহিকতায় আজ ১ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯টায় মহাখালী বাস স্ট্যান্ড নিউটন পুলিশ বক্সের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ যৌথ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন উত্তর পুলিশের ডিসি জুবায়ের, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. হুমায়ুন কবির খানসহ অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তা, পরিবহন নেতা এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিক।
সংবাদ সম্মেলনে সবার সমন্বয়ে ট্রাফিক যানজট নিরসনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। ডিসি জুবায়ের বলেন, “মহাখালী বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক যানজট একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা, যার কারণে সাধারণ মানুষকে নিয়মিত ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়। এই সমস্যা সমাধানে মহাখালীকে যানজটমুক্ত করার উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” তিনি জানান, এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৩০০ ফুট এলাকায় একটি আধুনিক ডিপো তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বাসগুলো নির্দিষ্ট সময় অবস্থানের মাধ্যমে যাত্রীসেবা নিয়ন্ত্রণ করছে। এর ফলে মহাখালী এলাকাবাসী যানজট থেকে বড় ধরনের মুক্তি পাচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, কার্যকর ব্যবস্থার ফলে গাড়িগুলো কোনো বাধা ছাড়াই নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে। এই সম্মিলিত উদ্যোগের সুফল পাওয়ায় সাধারণ যাত্রীরাও এটিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. হুমায়ুন কবির খান বলেন, “মহাখালী টার্মিনাল ঢাকা সিটির ঠিক মাঝখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনার আলোকে ট্রাফিক সেক্টরের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা যৌথভাবে কাজ করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে মহাখালী টার্মিনাল ও আশপাশের রাস্তাগুলো আজ একটি স্বাভাবিক ও স্বস্তিদায়ক অবস্থানে ফিরে এসেছে। এই স্বাভাবিক অবস্থা স্থায়ীভাবে বজায় রাখতে আগামী দিনেও ট্রাফিক পুলিশের সাথে মালিক-শ্রমিকদের যৌথ সহযোগিতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সংবাদ সম্মেলন শেষে ট্রাফিক পুলিশ, মালিক সমিতি ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ একযোগে সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ ও যানজট রোধে সরাসরি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। ট্রাফিক পুলিশের আন্তরিক সদিচ্ছা এবং মালিক-শ্রমিকদের কঠোরভাবে এই নির্দেশনাগুলো মেনে চলার মানসিকতা বজায় থাকলে মহাখালী এলাকায় দীর্ঘদিনের যানজট চিরতরে দূর হবে এবং নগরবাসীর যাতায়াত আরও অধিক স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সকলের।


