রুপসীবাংলা ৭১ঃ ঢাকা, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সুশীল সমাজের সংগঠন, মানবাধিকার রক্ষাকারী, গণমাধ্যমকর্মী এবং ডিজিটাল অধিকার কর্মীরা—প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর সংশোধনীগুলোর বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কোনো অর্থবহ গণ-পরামর্শ প্রক্রিয়া ছাড়াই এই সংশোধনীগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮’ (DSA)-এর চেয়েও বেশি পশ্চাৎমুখী বলে মনে হচ্ছে; এটি মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সেই পুরনো ধারাটিই অব্যাহত রেখেছে এবং একই সাথে বাক-স্বাধীনতা সংক্রান্ত অপরাধের পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে।
অর্থবহ গণ-পরামর্শের অভাব
প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো কোনো অর্থবহ গণ-পরামর্শ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রণয়ন করা হয়নি। নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় খসড়াটি আরও এগিয়ে নেওয়ার আগে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী, প্রযুক্তিবিদ এবং সাধারণ জনগণের এটি পর্যালোচনা বা এ বিষয়ে মতামত জানানোর কোনো প্রকৃত সুযোগ ছিল না বললেই চলে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ২০১৮ সালে নগণ্য জনমতের ভিত্তিতে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ (DSA) প্রণয়নের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের আমলেও এই একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। কেবল খসড়া প্রকাশ করলেই তাকে অর্থবহ পরামর্শ বলা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের মতামত প্রদানের জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকা এবং চূড়ান্ত ফলাফলে তাদের সুপারিশগুলোর প্রতিফলন ঘটা। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অর্থবহ পরামর্শ একটি মৌলিক পূর্বশর্ত—এটি কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো সৌজন্যমূলক বিষয় নয়। আইনের বিষয়বস্তু নিয়ে যার যে মতই থাকুক না কেন, পরামর্শ প্রক্রিয়ার এই ধারাবাহিক অনুপস্থিতি সবার জন্যই উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত।
বাক-স্বাধীনতা সংক্রান্ত অপরাধের পরিধি সম্প্রসারণ ও অস্পষ্ট সংজ্ঞা
প্রস্তাবিত সংশোধনীটি মানহানির সংজ্ঞাকে দণ্ডবিধির (Penal Code) গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত করে তুলেছে—যা এর আগে ডিএসএ (DSA) ও সিএসএ (CSA)-তে গৃহীত হয়েছিল। একইসাথে এতে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা, গুজব ও অপপ্রচারের মতো নতুন কিছু অপরাধের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; যার প্রতিটিই এমন সব ব্যাপক ও অস্পষ্ট সংজ্ঞার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিষয়টিকে ব্যক্তিগত বা মনগড়া ব্যাখ্যার সুযোগ করে দেয় এবং আইনের প্রয়োগে অসামঞ্জস্যতা সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করে। কোনো বক্তব্য মানহানিকর, মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর নাকি গুজব—তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন বিচারিক প্রক্রিয়ায় সতর্কতার সাথে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা, কোনো চটজলদি বা সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন নয়।
এই খসড়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সাংবাদিকতার সুরক্ষায় কোনো কার্যকর বিধান রাখা হয়নি। এতে অপরাধের সীমা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি, সুনির্দিষ্ট ক্ষতির প্রমাণ উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি এবং আইনের অপব্যবহার রোধে পর্যাপ্ত পদ্ধতিগত সুরক্ষাও নিশ্চিত করা হয়নি। এটি অনলাইনে মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে, বিচার-পূর্ব আটকের অনুমতি দেয় এবং সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড ও ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখে—যার ফলে আইনটির বাছাইমূলক প্রয়োগ এবং অভিযোগের সত্যতা যথাযথভাবে যাচাইয়ের আগেই শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়।
তথ্য-পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে একটি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে প্রথমবারের মতো এই সংশোধনী প্রক্রিয়ায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে—যা অতীতের চর্চা থেকে ভিন্ন একটি পদক্ষেপ। অতীতে সাইবার-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের বিষয়টি সাধারণত ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ছিল। এই নতুন ভূমিকার ভিত্তি ও পরিধি সম্পর্কে এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি।
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর এই পরিবর্তনটি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার নকশা বা বিন্যাস নিয়ে বৃহত্তর উদ্বেগের জন্ম দেয়। “মানহানি” (defamation), “অপদস্থকরণ” (maligning), “গুজব” (rumour) এবং “অপপ্রচার” (disinformation)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষাগুলো তথ্য ও মতপ্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ক্রমবর্ধমান প্রবণতাকে প্রতিফলিত করে। এটি ঔপনিবেশিক আমলের সেই আইনি ঐতিহ্যেরই প্রতিধ্বনি, যেখানে মতপ্রকাশের ওপর ব্যাপক ও অস্পষ্ট বিধিনিষেধ তথ্য নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্ল্যাটফর্মের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ, ব্যবহারকারীদের জন্য কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা এবং বিশ্বাসযোগ্য বিষয়বস্তু-ব্যবস্থাপনা (content-governance) কাঠামো গড়ে তোলার পরিবর্তে, এই সংশোধনীগুলো মূলত অনলাইনে কী থাকবে তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকেই আরও বাড়িয়ে তোলে।
সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা
আরও বেশ কিছু পরিবর্তন সামগ্রিক কাঠামোটিকে দুর্বল করে দেয়; এই কাঠামোটি মূলত সুরক্ষামুখী হওয়ার বদলে শাস্তিমূলক চরিত্রই বজায় রাখে। ‘মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯’-এর আওতায় নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার সুযোগ রাখাটা ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া’ (due process) এবং ‘সুষ্ঠু বিচারের নিশ্চয়তা’কে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করে—বিশেষ করে সেসব ক্ষেত্রে যেখানে বিতর্কিত মতপ্রকাশ এবং গুরুতর ফৌজদারি শাস্তির বিষয় জড়িত থাকে। ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন’-এর প্রতিনিধিত্ব বাদ দিয়ে ‘জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল’-এ আরও বেশি সরকারি কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই নির্বাহী বিভাগের আধিপত্য আরও জোরদার হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। এছাড়া, এই সংশোধনীগুলো অনলাইন বিষয়বস্তু ও প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতাকেও সম্প্রসারিত করে, যার ফলে আইনসভার কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নির্বাহী বিভাগের নিজস্ব বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।
এই ভারসাম্যহীনতা ৮ নম্বর ধারার সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এই সংশোধনীগুলো তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য নির্বাহী সংস্থাকে আরও ব্যাপক পরিসরে ও বিস্তৃত কারণে যেকোনো বিষয়বস্তু অপসারণের অনুরোধ জানানোর ক্ষমতা প্রদান করে—অথচ এক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিগত মানদণ্ড, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীকে নোটিশ প্রদান, স্বাধীন যাচাই-বাছাই বা আপিলের কার্যকর কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
আমাদের সুপারিশসমূহ
আমরা, নিম্নস্বাক্ষরকারীগণ, সরকারের প্রতি নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি:
১. ‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-এর সংশোধনী সংক্রান্ত বর্তমান খসড়াটি প্রত্যাহার করা।
২. পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের আগে সুশীল সমাজ, গণমাধ্যমকর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি অর্থবহ ও সময়াবদ্ধ পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু করা।
৩. অংশীজনদের সাথে ব্যাপক আলোচনার ভিত্তিতে আইনের একটি সংশোধিত খসড়া প্রণয়ন করা, যা সাইবার জগতের বৃহত্তর বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নেবে এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের ক্ষমতায়ন করবে; পাশাপাশি এটি যেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আওতায় বাংলাদেশের দায়বদ্ধতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
সংহতি প্রকাশে:
১. টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট
২. ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ
৩. সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন প্ল্যাটফর্ম
○ বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস
ট্রাস্ট
○ আইন ও সালিশ কেন্দ্র
○ আর্টিকেল ১৯
○ বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্নেন্স
ফোরাম
○ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
○ ব্র্যাক (BRAC)
○ বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন
○ সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন
○ সাইবার টিনস
○ ডিজিটালি রাইট
○ হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি
○ ইনস্টিটিউট ফর ইনফর্মড ডেভেলপমেন্ট
○ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
○ নারীপক্ষ
○ অরোদ্ধ ফাউন্ডেশন
○ দ্য টেক একাডেমি
○ ভয়েস


