রুপসীবাংলা ৭১ঃ গত ৫ আগষ্ট, ২০২৪ এর পর রাজনৈতিক বিবেচনায় অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়েছে যেখানে কোন কোন মামলায় ১২০০/১৩০০ জন বুদ্ধিজীবি, আইনজীবী, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণী -পেশার নাগরিকদের আসামী করা হয়েছে । তাদের অনেককে কোন বিশেষ রাজনৈতিক ঘটনা বা দলের সাথে সম্পৃক্ততা থাকার কারণে গ্রেফতার করা হয়েছে, এমনকি রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত নয় এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন এবং এদের অনেকের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট কোন প্রমান না থাকলেও দেড় বছরের অধিক সময় তাদের জামিন দেয়া হয়নি। এদের মধ্যে কয়েকজন সাংবাদিকও রয়েছেন। কেউ কেউ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই এই সকল অসুস্থ জামিনবিহীন ব্যক্তিদের মানবিক কারণে এবং সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক সু্িচকিৎসার জন্য তাদের জামিনে মুক্তি দেবার আহবান জানিয়ে ৩০ জন নাগরিক নিম্নোক্ত বিবৃতি প্রদান করেছেন।
“ আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি, ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট গণ অভুত্থানের পর শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় কিংবা কোন মহলের আক্রোশ বশত: কয়েক হাজার গণমামলা দায়ের করা হয়েছে যার মধ্যে কোন কোন মামলায় আসামী সংখ্যা ২০০০ পর্যন্ত আছে। এ থেকে ধারণা করা যায় শুধুমাত্র হয়রানি করার উদ্দেশ্যেই এ ধরণের মামলা দায়ের করা হয়েছে। একইভাবে সিংহভাগ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পেশাগত দায়িত্ব পালনে দৃশ্যত দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় ঢালাওভাবে হত্যার অভিযোগে দায়ের মামলায় তালিকাভুক্ত করে প্রতিশোধমূলকভাবে আটক রেখে জামিন নামঞ্জুর করে মানবাধিকার লংঘন করা হচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকেই বয়স্ক যাদের বয়স সত্তর থেকে আশির বেশি কেউ কেউ গুরুতর রূপে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে তারা যথাযথ চিকিৎসাও পাচ্ছেন না। সাবেক মন্ত্রী, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ইতিহাস গবেষক, লেখক, অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, পেশাজীবি নেতা, রাজনৈতিক বিবেচনায় এরকম অনেকেই রয়েছেন। তারা মারাত্মক অসুস্থ হওয়ায় তাদের স্বজন, পরিবার গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। যদিও জামিন পাওয়া যে কোন অন্তরীণ ব্যক্তির আইনগত ও সাংবিধানিক অধিকার, তথাপি এ সকল ক্ষেত্রে তা উপেক্ষা করা হচ্ছে। মামলা দায়েরের পর দেড় বছর পার হলেও অনেকের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত পুলিশ তদন্ত সম্পন্ন করেনি বা কোন চার্জশীটও প্রদান করেনি। ফলে এক প্রকার বিনা বিচারে তারা অসুস্থ অবস্থায় জেলে বন্দি জীবন পার করছেন। যদিও অন্তবর্তীকালীন সরকার একাধিক বার জোরের সাথে বলেছে, বিচার বিভাগ স্বাধীন। আমরা তার প্রতিফলন এই ক্ষেত্রে দেখিনি। শুধুমাত্র ভিন্নমত পোষণ করা এবং অন্তবর্তীকালীন সরকারের সমালোচনা করায় অনেক সাংবাদিককেও গ্রেফতার করে অন্তরীণ করা হয়েছে। এবং অধিকাংশের ক্ষেত্রে গ্রেফতারের পর তাদের নামে মামলা দেয়া হয়েছে। এক মামলায় হাইকোর্ট থেকে আইন অনুসারে জামিন হলেও অন্য মামলায় তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। কালা কানুন বাতিলসহ দেশের বেআইনী নিপিড়নের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বিষয়টি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উচ্চারন করেছেন। এবং এরই ধারাবাহিকতায় অতি সম্প্রতি বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, এ সরকার ন্যায় বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং তারা তা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর শুধুমাত্র হেনস্থা করার জন্য অনেক গণ মামলা হয়েছে যেখানে প্রায় প্রতি মামলায় ১০০০ উপর মানুষকে আসামী করা হয়েছে। তার মতে এটা পরিস্কার শুধুমাত্র হেনস্তার উদ্দেশ্যেই এসকল মামলা হয়েছে। এই সরকার ঐ সকল মামলা পুণ:মূল্যায়ন করবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি আরো বলেছেন, কেউ যেন বিনা কারণে শাস্তি না পায় তা নিশ্চিত করা হবে। তাই আমরা সরকারের এই অবস্থানের জন্য সাধুবাদ জানাই এবং একই সাথে যে সকল বুদ্ধিজীবি, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক এবং বিভিন্ন পেশায় যুক্ত নাগরিককে গত দেড় বছরকাল বিনা বিচারে আটক রাখা হয়েছে তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতের লক্ষ্যে অবিলম্বে জামিনে মুক্তি দেবার জন্য সরকারের কাছে আহবান জানাচ্ছি। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তাদের সেই অভিযোগ সম্পর্কে যথাযথ আইনী বিধান মেনে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত শেষে বিচার প্রক্রিয়াও যাতে দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হয়, তার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহনের আহবান রাখছি।”
বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন-
১. অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মানবাধিকার সংরক্ষন পরিষদ
২. খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি
৩. ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআই-বি
৪. অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও সভাপতি, আইন ও সালিস কেন্দ্র
৫. শিরীন পারভিন হক, সদস্য, নারী পক্ষ
৬. ড. শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী
৭. ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৮. শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি
৯. অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১০. অ্যাডভোকেট তবারক হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১১. রেহেনুমা আহমেদ, লেখক
১২. তাসনিম সিরাজ মাহবুব, সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৩. রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৪. ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৫. ড. খায়রুল চৌধুরী, অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৬. ড. ফিরদৌস আজিম, অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
১৭. ড. সাদাফ নূর, অধ্যাপক, ল্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি
১৮. ড. নাসরিন খন্দকার, নৃবিজ্ঞানী
১৯. পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক
২০. অ্যাডভোকেট সালমা আলী, নির্বাহী পরিচালক, বি এন ডব্লিউ এল এ
২১. সায়দিয়া গুলরুখ, সাংবাদিক
২২. মনিন্দ্র কুমার নাথ, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ
২৩. সালেহ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন
২৪. পারভেজ হাসেম, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী
২৫. জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ
২৬. অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, প্রধান নির্বাহী, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন
২৭. সাঈদ আহমেদ, মানবাধিকার কর্মী
২৮. দীপায়ন খীসা, মানবাধিকার কর্মী
২৯. মেইনথিন প্রমীলা, আদিবাসী অধিকার কর্মী
৩০. হানা শামস আহমেদ, পিএইচডি গবেষক, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা

