নিজস্ব প্রতিনিধি : রাষ্ট্রের ভোটাধিকার প্রাপ্ত নাগরিকগণ যে প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি বাছাই করেন তাকে নির্বাচন বলে। এই পদ্ধতিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দেশের শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করেন। ফলে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ সৎ, দক্ষ ও যোগ্য হলে শাসন ব্যবস্থাও উন্নত ও উৎকৃষ্ট হয়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচন জনগণ ও রাষ্ট্রের মাঝে সেতুবন্ধনের অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু এই সেতুবন্ধন শক্তিশালী করতে প্রয়োজন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এই সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের যথেষ্ট ভূমিকা ও প্রভাব রয়েছে, যথাঃ
(১) সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে বাছাই করতে ভোটার সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
(২) প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল কিংবা তাদের ভাড়া করা গুন্ডাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, ভীতি প্রদর্শন ও দুর্নীতি প্রতিরোধে গণমাধ্যম ভূমিকা রাখতে পারে।
(৩) ভোটাকেন্দ্রে অধিক সংখ্যক ভোটার উপস্থিতির জন্যেও গণমাধ্যমের ইতিবাচক প্রচারনা খুবই সহায়ক।
(৪) নির্বাচনের বৈধতার প্রশ্নে স্থানীয় জনগোষ্ঠি ও আন্তর্জাতিক কমিউনিটির আস্থা অর্জনে গণমাধ্যমের প্রচারণা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
(৫) নির্বাচন প্রক্রিয়া, নির্বাচন আচরণ বিধি, নির্বাচনী অপরাধ ও দন্ড প্রভৃতি বিষয়ে ভোটার ও প্রার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক বিধিবিধান ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান অপরিহার্য। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তেমনি একই সঙ্গে গণমাধ্যম কর্মীদের ভূমিকা আরো বেশী। ফলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে গণমাধ্যম কর্মীদেরকে নির্বাচনী সংবাদ কিংবা এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন বা বার্তা পরিবেশনে নিম্নবর্ণিত শর্ত পালন করে তাদের দায়িত্ব পালন করা উচিত।
(ক) সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ খবর বা প্রতিবেদন পরিবেশন করবেন। যদি কোন প্রার্থী তার প্রদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোন অভিয়োগ করেন তবে সাংবাদিককে অবশ্যই দু’পক্ষেরই মতামত নেয়া উচিত।
(খ) গণমাধ্যম কর্মী সর্বদা সঠিক তথ্য পরিবেশনে সচেষ্ট থাকবেন।
(গ) গণমাধ্যম কর্মী অর্থাৎ সাংবাদিকগণ প্রতিবেদন লেখা/ তৈরী করার সময় নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে কখনই বিবেচনায় আনবেন না।
(ঘ) সাংবাদিকরা এমন ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাকবেন। যা কোন প্রকার বৈষম্য, অস্থিরতা বা সহিংসতার জন্ম দিতে পারে (যেমনঃ বর্ণ, লিঙ্গ, যৌন শিক্ষা, ভাষা, ধর্ম, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং জাতীয়তা ও সামাজিক সত্ত্বা)।
(ঙ) সাংবাদিকগণ পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর কাছ থেকে কোন প্রকার সুবধিা গ্রহণ করবেন না।
(চ) সাংবাদিকগণ কোন রাজনৈতিক ব্যক্তির কাছে প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কোন প্রকার পূর্ব প্রতিশ্রুতি দেবেন না।
(ছ) সংবাদ পরিবেশনা হবে সঠিক ও পক্ষপাতহীন।
(জ) কোন প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন করা উচিত নয়।
(ঝ) সকল প্রার্থী যেন গণমাধ্যম থেকে প্রচারণার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ সুবিধা পায় এই বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে।
জনগণের মতামত সঠিকভাবে প্রতিফলিত হওয়ার একমাত্র বৈধ উপায় হচ্ছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা। এই প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম একটি অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে। তথ্য প্রদান, জনসচেতনতা সৃষ্টি, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা যুগে যুগে প্রমাণিত। একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে গণমাধ্যম কতটা দায়িত্বশীল ও পেশাদার ভূমিকা পালন করছে, তার ওপর নির্বাচন প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করে। গণমাধ্যম ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার সম্পর্ক নির্বাচন একটি নির্দিষ্ট দিনের ঘটনা হলেও এর প্রস্তুতি, প্রচার, ভোটগ্রহণ, ফলাফল ঘোষণা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা দীর্ঘ সময়জুড়ে বিস্তৃত। এই পুরো সময়জুড়ে গণমাধ্যম নাগরিকদের প্রধান তথ্যসূত্র হিসেবে কাজ করে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম, প্রার্থীদের অবস্থান, নির্বাচনী আচরণবিধি, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, ভোটকেন্দ্রের তথ্যসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গণমাধ্যমের মাধ্যমেই জনগণের কাছে পৌঁছে। সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য ছাড়া একজন ভোটার সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। নির্বাচনের আগে গণমাধ্যমের দায়িত্ব নির্বাচনের আগের সময়টিই সবচেয়ে সংবেদনশীল। এই পর্যায়ে গণমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণকে নিরপেক্ষ ও যাচাইকৃত তথ্য দেওয়া। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহার, কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতি তুলনামূলকভাবে তুলে ধরা গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এতে ভোটাররা বিভিন্ন দলের অবস্থান বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একই সঙ্গে ভুয়া তথ্য, গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে গণমাধ্যমকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হয়।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকা বা পেশিশক্তির ব্যবহার, প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ইত্যাদি বিষয় গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে উঠে এলে নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। এভাবে গণমাধ্যম একটি নজরদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পালন করে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রচার-প্রচারণায় ভারসাম্য রক্ষা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমকে সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হয়। একপেশে প্রচার বা নির্দিষ্ট দলকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি গণমাধ্যমকেও বিজ্ঞাপন ও সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে পেশাদার নৈতিকতা বজায় রাখতে হয়। নির্বাচনী বিতর্ক, টকশো ও মতামতভিত্তিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। এতে জনগণ ভিন্নমত শুনতে পারে এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়। তবে এসব অনুষ্ঠানে শালীনতা বজায় রাখা, বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাই করা এবং উসকানিমূলক বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করাও সমানভাবে জরুরি।
ভোটগ্রহণের দিন গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ, ভোটার উপস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য অনিয়মের তথ্য দ্রুত ও নির্ভুলভাবে তুলে ধরা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। তবে এই পর্যায়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন সংবাদ পরিবেশন পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। তাই তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো খবর প্রচার করা উচিত নয়।
ভোটগ্রহণ চলাকালে সাংবাদিকদের পেশাদার আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা মেনে কাজ করা, ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং কোনো পক্ষের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রভাব বিস্তার না করা গণমাধ্যমকর্মীদের নৈতিক দায়িত্ব। দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন ভোটারদের আস্থা বাড়ায় এবং নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করে তোলে।
ফলাফল ও পরবর্তী সময় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও গণমাধ্যমের ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা ও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। প্রাথমিক ফলাফল ও চূড়ান্ত ফলাফলের পার্থক্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরা না হলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে পরাজিত ও বিজয়ী উভয় পক্ষের প্রতিক্রিয়া ভারসাম্যপূর্ণভাবে প্রচার করা গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, অভিযোগ ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়েও গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হয়। গুজব বা উসকানিমূলক সংবাদ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। বরং শান্তি, সংলাপ ও আইনের শাসনের বার্তা প্রচারে গণমাধ্যম ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বড় প্রভাব ফেলছে। দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার সুবিধার পাশাপাশি ভুয়া খবর ও অপপ্রচারের ঝুঁকিও বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মূলধারার গণমাধ্যমের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। যাচাইকৃত তথ্য দিয়ে গুজব মোকাবিলা করা এবং ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের মাধ্যমে সত্য তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি।
ডিজিটাল গণমাধ্যমকে ক্লিক বা ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় না নেমে পেশাদার নীতিমালা মেনে চলতে হবে। শিরোনামনির্ভর অতিরঞ্জন বা অসম্পূর্ণ তথ্য পরিবেশন করলে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়, যা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অপরিহার্য। স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ না থাকলে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রকাশ পায় না। তবে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়বদ্ধতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বহীন সাংবাদিকতা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই পেশাগত নৈতিকতা, সত্যনিষ্ঠা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
গণমাধ্যম মালিকানা, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক চাপ অনেক সময় নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনে বাধা সৃষ্টি করে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাংবাদিকদের পেশাগত ঐক্য, নীতিমালা অনুসরণ এবং প্রতিষ্ঠানগত স্বচ্ছতা প্রয়োজন। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি, আর এই ভিত্তি শক্তিশালী করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দায়িত্বশীল, স্বাধীন ও পেশাদার গণমাধ্যম ছাড়া গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। তথ্যভিত্তিক সংবাদ পরিবেশন, ভারসাম্যপূর্ণ প্রচার, গুজব প্রতিরোধ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণমাধ্যম জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। সেই আস্থাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশে সুদৃঢ় গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সৎ ও যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

