রুপসীবাংলা৭১ অন্যান্য ডেস্ক : মৃত্যু মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত সত্য, অথচ সবচেয়ে উপেক্ষিত বাস্তবতা। মানুষ চায় দীর্ঘ জীবন, আরো সময়, আরো সুযোগ; কিন্তু একসময় প্রত্যেককেই দাঁড়াতে হয় সেই অনিবার্য দ্বারপ্রান্তে, যেখানে কোনো ক্ষমতা, মর্যাদা বা কৃতিত্ব কাজ করে না। আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত নবী-রাসুলগণও এর বাইরে নন। তবে তাঁদের মৃত্যু কেবল একটি সমাপ্তি নয়; বরং তা হয়ে ওঠে ঈমান, আখিরাতবোধ ও মানবিক অনুভূতির এক অনুপম দৃষ্টান্ত।
এমনই এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা আমরা দেখতে পাই মুসা আলাইহিস সালামের ইন্তেকালের প্রসঙ্গে, যা সহিহ হাদিসে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় বর্ণিত হয়েছে।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মৃত্যুর ফেরেশতাকে মুসা আলাইহিস সালামের নিকট তাঁর জান কবজের জন্য পাঠানো হয়েছিল। ফেরেশতা যখন তাঁর নিকট আসলেন, তখন তিনি তাঁকে সজোরে চপেটাঘাত করলেন। ফলে ফেরেশতা তাঁর রবের নিকট ফিরে গিয়ে বললেন, ‘আপনি আমাকে এমন এক বান্দার নিকট পাঠিয়েছেন, যে মরতে চায় না।
’
তখন আল্লাহ তায়ালা বললেন, ‘তুমি তার কাছে ফিরে যাও এবং তাকে বলো; সে যেন একটি গরুর পিঠে তার হাত রাখে। তার হাত যতগুলো পশমের ওপর পড়বে, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে তাকে এক বছর করে অতিরিক্ত জীবন দেওয়া হবে।’
ফেরেশতা ফিরে এসে তা জানালেন। সব শুনে মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, ‘হে আমার রব! তারপর কী হবে?’
আল্লাহ বললেন, ‘তারপর মৃত্যু।’
মুসা আলাইহিস সালাম বললেন, ‘তাহলে এখনই (আমার জান কবজ করা) হোক।’
এরপর বর্ণনাকারী বলেন, তিনি আল্লাহর নিকট আরজ করলেন—তাঁকে যেন ‘আরদে মুকাদ্দাস’ বা পবিত্র ভূমি থেকে পাথর নিক্ষেপের দূরত্বের সমান স্থানে পৌঁছে দেয়া হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি যদি সেখানে থাকতাম, তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদেরকে রাস্তার পাশে লাল টিলার নিচে তাঁর কবরটি দেখিয়ে দিতাম।’
এই হাদিসটি বাহ্যিকভাবে দেখলে বিস্ময় জাগে; একজন মহান নবী মৃত্যুর ফেরেশতার প্রতি এমন প্রতিক্রিয়া দেখালেন কেন? কিন্তু ইসলামের ব্যাখ্যাকারগণ স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো অবাধ্যতা নয়; বরং এটি ছিল স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া। মুসা আলাইহিস সালাম জানতেন না যে আগন্তুক মৃত্যুর ফেরেশতা।
আর নবীগণও মানবিক অনুভূতির ঊর্ধ্বে নন; তাঁরা ভয়, বিস্ময় ও আত্মরক্ষার স্বাভাবিক প্রবণতা অনুভব করেন, তবে আল্লাহর আদেশ স্পষ্ট হলে কোনো দ্বিধা রাখেন না।
আরও গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যায়, অতিরিক্ত হাজারো বছরের জীবন পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মুসা আলাইহিস সালাম তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী; তা দেরিতে হোক বা শিগগির। অতএব আখিরাতের প্রস্তুতি ও আল্লাহর সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষাই তাঁর কাছে বেশি প্রিয় হয়ে উঠেছিল।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় তাঁর শেষ আরজি—তিনি চেয়েছেন পবিত্র ভূমি ‘আরদে মুকাদ্দাস’-এর নিকটবর্তী স্থানে দাফন হতে। এটি প্রমাণ করে, আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের হৃদয়ে পবিত্র ভূমি ও আল্লাহর নির্বাচিত স্থানগুলোর প্রতি কী গভীর ভালোবাসা থাকে। জীবনে সেখানে প্রবেশের তাওফিক না হলেও মৃত্যুর পর হলেও তার সান্নিধ্যে থাকতে চাওয়া; এ এক অপূর্ব ঈমানি আকাঙ্ক্ষা।
এই হাদিস আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—
প্রথমত, মৃত্যু থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। দীর্ঘ জীবন নিজেই লক্ষ্য নয়; বরং ঈমান ও নেক আমলের মাধ্যমে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়াই মুমিনের আসল সাফল্য।
দ্বিতীয়ত, নবীগণ মানবিক হলেও আল্লাহর আদেশের সামনে পরিপূর্ণভাবে সমর্পিত। স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়ার পর মুসা আলাইহিস সালাম এক মুহূর্তও বিলম্ব চাননি।
তৃতীয়ত, পবিত্র স্থান ও দ্বিনি মূল্যবোধের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ। মৃত্যুর মুহূর্তেও একজন নবীর চিন্তা ছিল—আল্লাহর নির্বাচিত ভূমির নিকটবর্তী হওয়া।
সবশেষে বলা যায়, এই হাদিস কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের শেখায়; জীবন যতই দীর্ঘ হোক, শেষ ঠিকানার প্রস্তুতিই সবচেয়ে জরুরি। মৃত্যু যখন আসবেই, তখন তা যেন আসে ঈমান, সন্তুষ্টি ও আল্লাহর নৈকট্যের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে—এই চেতনায় নিজেকে গড়ে তোলাই মুমিনের প্রকৃত করণীয়।
রুপসীবাংলা৭১/এআর

