অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম (লবণ) ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ অতিপ্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাদ্যের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্বক ঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, ভোক্তার অধিকার রক্ষায় সঠিক খাদ্য নির্বাচনের অধিকার নিশ্চিত এবং অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ফ্রন্ট অফ প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা জরুরি। কারণ বাংলাদেশে বর্তমানে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার ৭১ শতাংশ। আর এসব রোগের অন্যতম কারণ অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম (লবণ) ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ।
আজ সোমবার (১৭ আগস্ট ২০২৬) দুপুর ২ টায় ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে “জনস্বাস্থ্য, ভোক্তা অধিকার রক্ষায় খাদ্যের মোড়কে স্বাস্থ্য সতর্কবাণী : ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং বিধান নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং করণীয়” শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স (সিএলপিএ), পাবলিক হেলথ ল’ ইয়ার্স নেটওয়ার্ক ও সিটিজেন নেটওয়ার্ক যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন বলেন, “জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে খাদ্যের মোড়কে সহজবোধ্য ও কার্যকর স্বাস্থ্য সতর্কবাণী নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। ভোক্তাকে বিভ্রান্ত না করে পণ্যের পুষ্টিগত ঝুঁকি সম্পর্কে প্রতিটি প্যাকেটজাত খাদ্যে স্পষ্ট তথ্য দেওয়ার জন্য জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, “প্যাকেটজাত খাদ্য, বেভারেজ, ড্র্রিংকসের মাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত বিষ খাচ্ছি। এসব খাবার থেকে নতুন নতুন রোগের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে জনস্বাস্থ্য ও দেশের স্বার্থে আমাদেরকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদ খাদ্য নিরাপদসহ সবার সাথে কাজ করতে হবে। দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন করে শিক্ষককেও যদি নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে জানানো যায় তাহলে সব শিশুদের সচেতন করা সম্ভব হবে। তাহলে আমরা ভবিষ্যতে এর ইতিবাচক ফল পাবো।”
অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও ঢাকা ডেন্টাল কলেজের সাবেক ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. মোঃ শিব্বির আহমেদ ওসমানী, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের হেড অব প্রোগ্রাম ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী, ডাব্লিউ বিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী ও সিএলপিএ এর কনসালটেন্ট অধ্যাপক ড. আ ফ ম সারোয়ার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএমইউ এর ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথের চেয়ারম্যান মোঃ আতিকুল হক এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিএলপিএ এর সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিএলপিএ এর হেড অব প্রোগ্রাম আমিনূল ইসলাম বকুল।
অনুষ্ঠানে সঞ্চলনা করেন সিএলপি এর সিনিয়র পলিসি অ্যানালিস্ট কামরুন্নিছা মুন্না। এছাড়া অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন, ভাইটাল স্ট্যাটেজিসের পরামর্শক আমিনুল ইসলাম সুজন, ডাব্লিউ বিবি ট্রাস্টের হেড অব প্রোগ্রাম সৈয়দ অনন্যা রহমান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের এডভোকেট মমতাজ মেী, বাংলাদেশ ইউনির্ভাসিটি অব হেলথ সাইন্সের সহযোগী অধ্যাপক পলাশ চন্দ্র বণিক, চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের শাহ ইসবাত আজমেরি, নারী পক্ষের সৈয়দা সালমা পারভিন ও জাইকার পরামর্শক ড. মাহফুজুর রহমান ভুঁইয়া।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাদ্যের নিয়মিত গ্রহণ এসব রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের মধ্যে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মিষ্টিজাতীয় পানীয় ও ফাস্টফুডের জনপ্রিয়তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। ফলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্যের মোড়কের তথ্য এমন হতে হবে, যা সাধারণ ভোক্তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বুঝতে পারেন। জটিল পুষ্টি তথ্য, বিভ্রান্তিকর দাবি বা পণ্যের প্রচারণামূলক উপস্থাপনার পরিবর্তে অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলো সামনের অংশে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
তারা আরও বলেন, এফওপিএল কেবল একটি লেবেলিং ব্যবস্থা নয়, এটি ভোক্তার তথ্য জানার অধিকার, নিরাপদ খাদ্য নির্বাচনের অধিকার এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত হাতিয়ার। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় বাংলাদেশে এমন একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস এবং জনস্বাস্থ্যের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সেমিনারে কার্যকর এফওপিএল বাস্তবায়নের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক পুষ্টিমান নির্ধারণ, সহজবোধ্য ও দৃশ্যমান স্বাস্থ্য সতর্কবাণী, বাধ্যতামূলক প্রয়োগ, শক্তিশালী বাজার নজরদারি, আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর শাস্তি এবং ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

