রুপসীবাংলা৭১ অন্যান্য ডেস্ক : বনি ইসরাইলের প্রতিটি ইতিহাস মানবজাতির জন্য সতর্কবার্তা, শিক্ষা এবং ঈমানের এক গভীর পরীক্ষা। তাই আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বারবার তাদের আলোচনা করেছেন, যাতে আমরা তাদের থেকে শিক্ষা নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করি। কেননা আল্লাহ তাআলা তাদের অসংখ্য নিদর্শন দেখিয়েছিলেন-ফিরআউনের জুলুম থেকে মুক্তি, সাগর দ্বিখণ্ডিত হওয়া, আকাশ থেকে মান্না-সালওয়া অবতির্ণ হওয়া-এসব কিছু প্রত্যক্ষ করার পরও তাদের অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাসের অভাব রয়ে গিয়েছিল। এই দুর্বল ঈমানই একসময় তাদের এমন এক দুঃসাহসিক ও অবিবেচক দাবির দিকে নিয়ে যায়, যা মানবসীমার সম্পূর্ণ বাইরে।
তারা নবী মুসা (আ.)-এর মাধ্যমে আল্লাহর বাণী শোনার পরও তারা একবার বলে বসল, ‘হে মুসা! আমরা কখনো তোমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করব না, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখি।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৫৫)
এই কথাটি শুধু নিছক তাদের প্রশ্ন ছিল না, বরং এতে ছিল অবিশ্বাস, ঔদ্ধত্য এবং আল্লাহর মহিমাকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়ার প্রমাণ। কারণ দুনিয়ার জীবনে মানুষের পক্ষে আল্লাহকে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব নয়। এটি ঈমানের মূলনীতির বিরোধী।
তবুও তারা এই সীমালঙ্ঘন করল, যেন আল্লাহকে নিজেদের শর্তে দেখতে চায়। এরপর যা ঘটল, তা একদিকে যেমন ভয়াবহ ও অন্যদিকে শিক্ষণীয়ও বটে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারপর তোমাদেরকে বজ্রাঘাত গ্রাস করল, আর তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৫৫)
মুহূর্তের মধ্যেই তারা বজ্রাঘাতে নিথর হয়ে পড়ল-অহংকার ও অবাধ্যতার কঠিন পরিণতি তাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
এই ঘটনা শিখায়, যখন মানুষ সীমা অতিক্রম করে এবং আল্লাহর প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে, তখন শাস্তি কতটা তাৎক্ষণিক ও কঠোর হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু। তিনি শাস্তির পরেও তাদের সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেননি। বরং তিনি বলেন, ‘এরপর তোমাদের মৃত্যুর পর আমি তোমাদের পুনরুজ্জীবিত করলাম, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৫৬)
বনি ইসরাইলের মৃত্যুর পর আবার জীবন দান করা ছিল এক বিরল অনুগ্রহ, যা তাদের নতুন করে সুযোগ দেওয়ার জন্যই প্রদান করা হয়েছিল-যেন তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে এবং কৃতজ্ঞতার পথে ফিরে আসে।
একই ঘটনার আরেকটি দিক সুরা আরাফে বর্ণিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘মুসা (আ.) তাঁর সম্প্রদায় থেকে নির্বাচিত লোকদের নিয়ে গিয়েছিলেন, আর তাদের উপর এক ভয়ংকর কম্পন বা শাস্তি নেমে আসে।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৫৫)
এই পুরো ঘটনাটি আমাদের সামনে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরে। প্রথমত, ঈমান মানে শুধু দৃশ্যমান জিনিসে বিশ্বাস করা নয়। বরং অদৃশ্যের প্রতি দৃঢ় আস্থা রাখা। দ্বিতীয়ত, অহংকার ও অতিরিক্ত যুক্তিবাদিতা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। তৃতীয়ত, আল্লাহর শাস্তি যেমন বাস্তব, তেমনি তাঁর দয়াও অসীম-তিনি চাইলে শাস্তির পরও ক্ষমা করে নতুন জীবন দান করতে পারেন।
তাই মানুষ যত বড় নিদর্শনই দেখুক না কেন, যদি তার অন্তরে কৃতজ্ঞতা ও বিনয় না থাকে, তবে সে সত্যের পথে স্থির থাকতে পারে না। বনি ইসরাইলের এই দাবি ছিল তাদের অন্তরের সেই দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। আর তাদের পুনরুজ্জীবন ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে এক শেষ সতর্কবার্তা-ফিরে আসো, কৃতজ্ঞ হও, এবং সত্যিকার অর্থে ঈমান গ্রহণ করো। অতএব, এই ঘটনা আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি আয়না। আমরা যেন কখনো আল্লাহর নিদর্শনকে অস্বীকার না করি, অযৌক্তিক দাবি না তুলি এবং অহংকারে অন্ধ না হই। বরং অদেখা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখে, তার অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং বিনয়ী বান্দা হিসেবে জীবন যাপন করি-এই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা।
রুপসীবাংলা৭১/এআর

