রুপসীবাংলা৭১ অন্যান্য ডেস্ক : ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মহান ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের জীবন শুধু ইতিহাসের অংশ নয়, বরং আদর্শ, প্রেরণা এবং আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁদেরই একজন হলেন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)। তিনি ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম দিকের সাহাবীদের অন্যতম, কোরআন সংকলনকারীদের একজন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় সাহাবী। তাঁর মর্যাদা এতটাই উচ্চ ছিল যে, মহানবী (সা.) তাঁকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁকে এই উম্মাহর ‘বিশ্বস্ত ব্যক্তি’ (আমিন) উপাধিতে ভূষিত করেন।
একবার নাজরানের কিছু লোক মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে তাদের জন্য একজন প্রতিনিধি পাঠানোর অনুরোধ করলে তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের কাছে একজন সত্যিকারের বিশ্বস্ত ব্যক্তি পাঠাব।’ তখন সাহাবিরা এ দায়িত্ব পাওয়ার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেন, নেতৃত্বের লোভে নয়, বরং নবীর প্রশংসিত গুণের প্রতিফলন হওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। এমনকি ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-ও এ সম্মান লাভে আগ্রহী ছিলেন।কিন্তু মহানবী (সা.) সবার মধ্য থেকে আবু উবাইদাহ (রা.)-কেই নির্বাচন করে বললেন, ‘উঠে দাঁড়াও, হে আবু উবাইদাহ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৭২৫৪)
আরেক হাদিসে আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক জাতির একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি থাকে, আর এ উম্মাহর বিশ্বস্ত ব্যক্তি হলো আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৪৩৮২)মহানবী (সা.) তাঁকে নাজরানের খ্রিস্টানদের কাছে পথপ্রদর্শক ও শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেন। পরে তিনি তিনশ জন সাহাবির একটি বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত হন।
সীমিত রসদ-মাত্র কিছু খেজুর-নিয়ে তিনি অসাধারণ দক্ষতায় সৈন্যদের মধ্যে তা বণ্টন করেন, যাতে সবাই সমানভাবে উপকৃত হতে পারে। যখন এই বাহিনী সমুদ্রতীরে পৌঁছায়, আল্লাহ তাআলা তাঁদের জন্য এক বিস্ময়কর সাহায্যের ব্যবস্থা করেন, একটি বিশাল তিমি মাছ, যা থেকে তাঁরা দীর্ঘদিন আহার করেন। এই ঘটনাটি ইতিহাসে ‘সমুদ্রের তরবারির অভিযান’ নামে পরিচিত। পরবর্তীতে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.)-এর পরিবর্তে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তাঁকে শাম অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তাঁর নেতৃত্বে একের পর এক বিজয় অর্জিত হয় এবং ইসলামের পতাকা সুদূর অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
আবু উবাইদাহ (রা.) ছিলেন সত্যিকার অর্থেই বিশ্বস্ত, সাহসী ও নির্ভীক একজন নেতা। তিনি ছিলেন নবী (সা.)-এর একনিষ্ঠ রক্ষাকর্তা। উহুদের যুদ্ধে যখন মহানবী (সা.)-এর মুখে আঘাত লাগে এবং হেলমেটের দুটি লোহার রিং তাঁর গালে ঢুকে যায়, তখন আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং আবু উবাইদাহ (রা.) দ্রুত তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসেন। আবু উবাইদাহ (রা.) নিজের দাঁত দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সেই রিং দুটি বের করেন। প্রথমটি তুলতে গিয়ে তাঁর একটি দাঁত পড়ে যায়, এবং দ্বিতীয়টি তুলতে গিয়ে আরেকটি দাঁতও পড়ে যায়। এভাবে তিনি দাঁতহীন হয়ে পড়েন, কিন্তু প্রিয় নবীর কষ্ট লাঘবে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। এই ঘটনা তাঁর ভালোবাসা, ত্যাগ এবং আনুগত্যের অনন্য নিদর্শন।
তবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সরল ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তি। নেতৃত্বে থেকেও তাঁর মধ্যে বিন্দুমাত্র অহংকার ছিল না। বরং তিনি প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর সৈন্যদের সাথে পরামর্শ করতেন। তাঁর জীবনে ছিল না বিলাসিতা; বরং ছিল আল্লাহর প্রতি গভীর নির্ভরতা ও আখিরাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। এই মহান সাহাবির জীবন আমাদের শেখায়, নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা নয়, বরং দায়িত্ব, ত্যাগ, বিশ্বস্ততা এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা। তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ইসলাম ও মানবতার কল্যাণে। তাই আজকের যুগে তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা ও আত্মত্যাগের গুণাবলির মধ্যেমে নিজেদের গড়ে তুলতে পারি, তবে সেটাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন।
রুপসীবাংলা৭১/এআর

