নিজস্ব প্রতিনিধিঃ জুলাই পরবর্তী মামলায় যশোর কারাগারে অন্তরিন জুয়েল হোসেন সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পরও তাদের শেষকৃত্যে অংশগ্রহনের জন্য আইন অনুযায়ী জুয়েল হোসেন সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দিয়ে মৃত স্ত্রী ও সন্তানকে জেলগেটে নিয়ে দেখানোর ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে ৩৯ জন নাগরিক নিম্নোক্ত বিবৃতি প্রদান করেছেন।
“ আমরা গভীর ক্ষোভের সাথে লক্ষ করলাম, জুলাই অভুত্থান পরবর্তী সময়ের কয়েকটি মামলায় বাগেরহাট সাবেকডাঙ্গা উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হোসেন সাদ্দাম গত ১১ মাস যাবৎ জেলা কারাগারে রয়েছেন। প্রথমে তিনি বাগেরহাট জেলা কারগারে থাকলেও ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তাকে যশোর কেন্দ্রিয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। পরিবার ও পুলিশের ভাষ্যমতে গত ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখ সাদ্দামের স্ত্রী সুবর্ণা স¦র্ণালীকে নিজ ঘরে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় এবং তার ৯ মাস বয়েসী শিশুপুত্রকে মেঝেতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবারের লোকেরা জানান, সাদ্দামের জামিন না হওয়ায় তার স্ত্রী হতাশায় ভুগছিলেন। এছাড়া সাদ্দাম তার সন্তানের জন্মের পর তাকে দেখেননি। এ নিয়েও তার মন ভরাক্রান্ত ছিল। সাদ্দামের স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার পরিবার প্যারোলের আবেদন নিয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসন হতে যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয় পর্যন্ত ছুটে গেছে কিন্তু আমলাতান্ত্রিক উদাসিনতা আর সাপ্তাহিক ছুটির দিনের ছুতোয় কেউই তাঁদের সহায়তা করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেননি। বরং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের সংবাদ থেকে জানা যায়, পুলিশের ডিএসবি প্রতিবেদন দেয় যে, সাদ্দামকে নিয়ে আসা হলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে পারে, সেই আশঙ্কা থেকে জেলা প্রশাসনকে জানানো হয় তাদের আবেদনটি ইতিবাচকভাবে না নেওয়ার জন্যে। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক সংবাদ মাধ্যমকে জানান, সাদ্দামের প্যারোলের জন্য আবেদন করা হয়েছিল। তবে আবেদনটি সঠিক জায়গায় করা হয়নি তাই তাদের যশোর জেলা প্রশাসকের কাছে যেতে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, সাদ্দামের পরিবারের পক্ষ থেকে যশোর জেলা প্রশাসকের কাছে কোন আবেদন করেনি বরং মানবিক দিক বিবেচনা করে তাকে জেল গেটে স্ত্রী ও সন্তানের লাশ দেখতে দেয়া হয়েছে। ছেলে কারাগারে, ঘরে পুত্রবধু এবং নাতির জোরা লাশ- এ অবস্থায় বাগেরহাট না যশোর, কারা প্রশাসন না জেলা প্রশাসন নাকি পুলিশ প্রশাসন, শুক্রবার না শনিবার- তখন একটা পরিবারের কি এতকিছুর খোঁজ খবর জানার কথা? তারপরেও সাদ্দামের পরিবার যশোর বাগেরহাট দৌঁড়াদৌড়ি করেছে, লিখিত আবেদন করেছে। কিন্তু কোন ফলাফল আসেনি। অগত্যা নিরুপায় হয়ে বাগেরহাট থেকে লাশবাহী গাড়ীতে করে শেষ দেখা দেখানোর জন্য দুইজনের লাশ নিয়ে আসা হয় যশোর কেন্দ্রিয় কারাগারে। সেখানে সাদ্দাম ৫ মিনিটের জন্য দেখেন তার ভালবাসার স্ত্রী ও না দেখা আদরের সন্তানকে। আমরা এহেন ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানাই। আমলাতন্ত্রের এই অমানবিক, অবিবেচক ও নিষ্ঠুর আচরণের জন্য আমরা তাদেরকে ধিক্কার জানাই। একই সাথে একথাও উল্লেখ করা জরুরি যে, বিচার প্রক্রিয়ার নামে এ ধরনের অবহেলা বা প্রতিহিংসামূলক ও অমানবিক আচরনের দায় অন্তবর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গও এড়াতে পারেন না।
সাদ্দাম কোন ফাঁসির আসামী ছিলেন না, যে তাকে প্যারোলে মুক্তি দিলে অনেক ভয়ের কারণ হতে পারে। যদি তাও হতো তবু তার নিকট আত্মীয় মারা গেলে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য প্যারোলে মুক্তি প্রদান আইন স্বীকৃত। আর এই ব্যাপারে সাদ্দামের রাজনৈতিক মতামত বা তার কোন অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে কি নাই তা আমাদের কাছে নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক। সুতারং যে সকল সরকারী কর্মকর্তা এই ঘটনার জন্য দায়ী, উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি। সকল প্রকার অন্যায় ও বিচারহীনতার যে ঘোষণা দিয়ে এই সরকার তার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, দিন গড়ানোর সাথে সাথে তা শুধু কথার কথাই থেকে যাচ্ছে। তাই সাদ্দামের ক্ষেত্রে স্ত্রী ও পুত্র সন্তানের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরও তাদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে তাকে যোগ দেয়ার জন্য প্যারোলে মুক্তি না দেয়া তারই আর একটি দৃষ্টান্ত মাত্র।”
বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করছেন-
১. অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মানবাধিকার সংরক্ষন পরিষদ
২. শিরীন পারভিন হক, সদস্য, নারীপক্ষ
৩. খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি
৪. ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআই-বি
৫. রাশেদা কে. চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
৬. অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও সভাপতি, আইন ও সালিস কেন্দ্র
৭. ড. শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী
৮. ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অনরারি নির্বাহী পরিচালক, ব্লাস্ট ও সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
৯. শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি
১০. শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
১১. ড. শাহনাজ হুদা, অধ্যাপক,আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১২. মো: নুর খান, মানবাধিকার কর্মী
১৩. ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৪. ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৫. অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১৬. অ্যাডভোকেট তবারক হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১৭. ড. ফস্টিনা পেরেইরা, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১৮. অ্যাডভোকেট মিনহাজুল হক চৌধুরী, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১৯. তাসনিম সিরাজ মাহবুব, সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২০. রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২১. ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২২. ড. ফিরদৌস আজিম, অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
২৩. পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক
২৪. অ্যাডভোকেট সালমা আলী, নির্বাহী পরিচালক, বি এন ডব্লিউ এল এ
২৫. রেহেনুমা আহমেদ, লেখক
২৬. সায়দিয়া গুলরুখ, সাংবাদিক
২৭. ঈশিতা দস্তিদার, গবেষক
২৮. সালেহ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন
২৯. পারভেজ হাসেম, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী
৩০. রেজাউল করিম চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ট্রাস্ট
৩১. জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ
৩২. অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, প্রধান নির্বাহী, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন
৩৩. সাঈদ আহমেদ, মানবাধিকার কর্মী
৩৪. দীপায়ন খীসা, মানবাধিকার কর্মী
৩৫. মেইনথিন প্রমীলা, আদিবাসী অধিকার কর্মী
৩৬. আবু আহমেদ ফয়জুল কবির, মানবাধিকার কর্মী
৩৭. মাবরুক মোহাম্মদ, মানবাধিকার কর্মী
৩৮. হানা শামস আহমেদ, পিএইচডি গবেষক, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা
৩৯. শাহ-ই-মবিন জিননাহ, নির্বাহী পরিচালক, সিডিএ

