রুপসীবাংলা৭১ তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক : নতুন স্মার্টফোন কেনার সময় ক্রেতাদের বড় একটি অংশ প্রথমেই জানতে চান, ফোনটিতে কত জিবি র্যাম রয়েছে। ৮ জিবি, ১২ জিবি কিংবা ১৬ জিবি র্যামের বিজ্ঞাপনও এখন বেশ চোখে পড়ে। ফলে অনেকের মধ্যেই ধারণা তৈরি হয়েছে, র্যাম যত বেশি হবে, ফোনের গতিও তত বেশি হবে। তবে বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। একটি স্মার্টফোন কতটা দ্রুত ও সাবলীলভাবে কাজ করবে, তা শুধু র্যামের ওপর নির্ভর করে না। প্রসেসর, স্টোরেজ, সফটওয়্যারসহ আরও বেশ কিছু বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই ফোন কেনার সময় র্যামের সংখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর কাজ এবং পারফরম্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়গুলোও জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
র্যামের কাজ কী?
র্যাম বা র্যান্ডম অ্যাকসেস মেমোরি হলো ফোনের অস্থায়ী মেমোরি। ব্যবহারকারী যখন একাধিক অ্যাপ চালু রাখেন, তখন সেগুলোর প্রয়োজনীয় তথ্য সাময়িকভাবে র্যামে সংরক্ষিত থাকে। এর ফলে একটি অ্যাপ থেকে অন্য অ্যাপে যাওয়ার পর আগের অ্যাপে ফিরে এলে সেটি অনেক সময় আগের অবস্থাতেই পাওয়া যায়।
ফোনের গতিতে প্রসেসরের ভূমিকা বেশি
স্মার্টফোনের সামগ্রিক পারফরম্যান্স নির্ধারণে প্রসেসর বা চিপসেটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাপ চালানো, গেম খেলা, ছবি তোলা কিংবা ভিডিও সম্পাদনার মতো কাজগুলো কত দ্রুত হবে, তার বড় একটি অংশ প্রসেসরের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
এ কারণে ৮ জিবি র্যাম থাকা পুরোনো চিপসেটের ফোনের তুলনায় ৬ জিবি র্যামের আধুনিক প্রসেসরযুক্ত ফোন ভালো পারফরম্যান্স দিতে পারে।
ফোন কেনার সময় শুধু প্রসেসরের ব্র্যান্ড নয়, নির্দিষ্ট মডেল, প্রজন্ম ও সক্ষমতাও যাচাই করা উচিত। স্ন্যাপড্রাগন, মিডিয়াটেক ডাইমেনসিটি, অ্যাপল এ-সিরিজ কিংবা এক্সিনোসের বিভিন্ন চিপসেটের মধ্যে পারফরম্যান্সের পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে গেমিং বা ভারী কাজের জন্য ফোন কিনলে চিপসেটের বাস্তব পারফরম্যান্স সম্পর্কে ধারণা নেওয়া জরুরি।
স্টোরেজের গতিও প্রভাব ফেলে
ফোনের স্টোরেজ বলতে সাধারণত ছবি, ভিডিও, অ্যাপ ও অন্যান্য ফাইল রাখার জায়গাকে বোঝানো হয়। তবে স্টোরেজের ধারণক্ষমতার পাশাপাশি এর প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে স্মার্টফোনে বিভিন্ন ধরনের স্টোরেজ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। যেমন, ইএমএমসি তুলনামূলক ধীরগতির। অন্যদিকে ইউএফএস ২.২, ইউএফএস ৩.৩ এবং ইউএফএস ৪.০ ক্রমান্বয়ে আরও উন্নত গতি দিতে পারে।
দ্রুত স্টোরেজ থাকলে অ্যাপ চালু করা, বড় ফাইল স্থানান্তর এবং গেম লোড করার মতো কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়। ফলে বেশি র্যাম থাকা সত্ত্বেও ধীরগতির স্টোরেজযুক্ত ফোনে কাঙ্ক্ষিত পারফরম্যান্স নাও পাওয়া যেতে পারে।
সফটওয়্যারের মানও গুরুত্বপূর্ণ
একই পরিমাণ র্যাম ও কাছাকাছি হার্ডওয়্যার থাকা সত্ত্বেও দুটি ফোনের ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় পার্থক্য দেখা যায়। এর অন্যতম কারণ সফটওয়্যার অপটিমাইজেশন।
ফোনের অপারেটিং সিস্টেম, ইউজার ইন্টারফেস এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে চলা অ্যাপগুলো র্যাম ও প্রসেসরের ওপর প্রভাব ফেলে। কিছু ফোনে অতিরিক্ত প্রি-ইনস্টলড অ্যাপ এবং ভারী ইউজার ইন্টারফেস থাকায় সিস্টেমের রিসোর্স বেশি ব্যবহার হয়।
অন্যদিকে ভালোভাবে অপটিমাইজ করা সফটওয়্যার তুলনামূলক সীমিত হার্ডওয়্যারেও সাবলীল অভিজ্ঞতা দিতে পারে। এ কারণেই আইফোনের মতো ডিভাইসে তুলনামূলক কম র্যাম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে ভালো পারফরম্যান্স দেখা যায়।
তাই ফোন কেনার আগে শুধু স্পেসিফিকেশন না দেখে সফটওয়্যার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, আপডেট সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি পারফরম্যান্সের রিভিউ দেখে নেওয়া ভালো।
ভার্চুয়াল র্যাম কি সত্যিই কাজে আসে?
বর্তমানে অনেক স্মার্টফোনের বিজ্ঞাপনে ৮ জিবি র্যামের পাশাপাশি আরও ৮ জিবি এক্সটেন্ডেড বা ভার্চুয়াল র্যামের কথা উল্লেখ করা হয়। এতে মোট ১৬ জিবি র্যাম মনে হলেও বিষয়টি আসলে তেমন নয়।
ভার্চুয়াল র্যাম তৈরির জন্য ফোনের অভ্যন্তরীণ স্টোরেজের একটি অংশ ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী এটি অস্থায়ী মেমোরির মতো কাজ করতে পারে। তবে স্টোরেজের গতি প্রকৃত র্যাম তুলনায় অনেক কম।
ফলে ভার্চুয়াল র্যাম কিছু পরিস্থিতিতে ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করলেও এটি প্রকৃত বিকল্প হতে পারে না। তাই ৮ জিবি র্যামের ফোনে ভার্চুয়াল র্যাম যোগ করে ১৬ জিবি হিসেবে প্রচার করা হলে সেটিকে আসল ১৬ জিবি র্যাম মনে করা ঠিক হবে না।
স্মার্টফোন কেনার আগে যে বিষয়গুলো যাচাই করবেন
একটি ভালো স্মার্টফোন বেছে নিতে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রসেসর: চিপসেটের মডেল, প্রজন্ম ও পারফরম্যান্স সম্পর্কে জেনে নিন।
স্টোরেজ: ফোনে ইএমএমসি নাকি ইউএফএস স্টোরেজ ব্যবহার করা হয়েছে, তা যাচাই করুন।
ডিসপ্লে: পর্দার রিফ্রেশ রেট, রেজল্যুশন ও প্যানেলের মান দেখে নিন।
ব্যাটারি: ব্যাটারির ধারণক্ষমতার পাশাপাশি চার্জিং প্রযুক্তি ও ব্যাকআপ কেমন, তা বিবেচনা করুন।
সফটওয়্যার আপডেট: ফোনটি কত দিন অ্যান্ড্রয়েড ও নিরাপত্তা আপডেট পাবে, সেটি জেনে নিন।
বাস্তব অভিজ্ঞতা: কেনার আগে নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলের রিভিউ দেখুন। সম্ভব হলে দোকানে ফোনটি নিজে ব্যবহার করে দেখুন।
ওয়ারেন্টি ও দাম: অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং বর্তমান বাজারদর যাচাই করে তারপর সিদ্ধান্ত নিন।
স্মার্টফোনের ভালো পারফরম্যান্সের জন্য র্যাম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটিই সবকিছু নয়। শক্তিশালী প্রসেসর, দ্রুত স্টোরেজ এবং উন্নত সফটওয়্যার অপটিমাইজেশন একসঙ্গে কাজ করেই একটি ফোনকে দ্রুত ও সাবলীল করে তোলে।
তাই শুধু বিজ্ঞাপনে বড় করে লেখা র্যামের সংখ্যা দেখে ফোন কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। নিজের ব্যবহারের ধরন, প্রয়োজন এবং বাজেট অনুযায়ী সঠিক সমন্বয়ের ফোন বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
রুপসীবাংলা৭১/এআর


