গৌতম কুমার এদবর
ইতিহাস বিভাগ
শিক্ষাবর্ষ ১৯৯৪-৯৫
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনা ও এর জেরে আয়োজিত ‘গরুভোজ’ কর্মসূচি দেশের উচ্চশিক্ষালয়গুলোতে পারস্পরিক সহনশীলতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সমাপনী উৎসবকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সামান্য ভুল–বোঝাবুঝি ও বিতর্কের যে পরিণতি আমরা দেখলাম, তা কেবল একটি একক ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সার্বিক পরিবেশ ও সংস্কৃতির একটি গভীর দিককে উন্মোচন করে।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের নিকটবর্তী মুক্তমঞ্চে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নাকে কেন্দ্র করে। সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল যে মন্দিরের সামনে এমন আয়োজন তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে। যদিও আয়োজক শিক্ষার্থীরা পরে ভুল স্বীকার করে তা সমাধান করেছিলেন, তবুও বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে।
এর প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে পশু জবাই নিষিদ্ধ করে যে বিজ্ঞপ্তি দেয়, তা শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি করে বিশেষ করে জাকুসু । তাদের মতে, এটি খাদ্যাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক চর্চার স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে মনে করেন। জাকসু ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ মিছিল করে বিভিন্ন স্লোগান দেয় এবং গরুভোজ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে প্রশাসন তাদের বিজ্ঞপ্তির ব্যাখ্যা দিয়ে ভুল–বোঝাবুঝির জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) পূর্বঘোষিত ‘গরুভোজ’ কর্মসূচি থেকে সরে আসেনি।
বাংলাদেশ একটি বহুধর্মীয় ও বহুসংস্কৃতির দেশ। এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তচিন্তা, জ্ঞানচর্চা এবং সব মতের মানুষের মেলবন্ধনস্থল। ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস, খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির অধিকার যেমন সুরক্ষার দাবি রাখে, তেমনি অন্য কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতি বা পবিত্রতায় আঘাত না হানার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সংবেদনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়াও সমান জরুরি।
প্রশাসনের ভূমিকা এক্ষেত্রে হওয়া উচিত আরও বিচক্ষণ ও নিরপেক্ষ। কোনো একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে, বরং উভয় পক্ষের সাথে সংলাপের মাধ্যমে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। আবার শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও যেকোনো আনন্দ বা উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে চারপাশের পরিবেশ ও সহপাঠীদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো আবশ্যক।
সংঘাত বা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে প্রশাসন, শিক্ষার্থী এবং ছাত্রসংগঠনগুলোকে শিক্ষা নিতে হবে। ক্যাম্পাসে স্থায়ী শান্তি, শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে সব পক্ষের মধ্যে কার্যকর সংলাপ এবং একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ বা আচরণবিধি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই হোক সকলের মূল লক্ষ্য।


