মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু
বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল সরকার পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; এটি একটি জাতির সংগ্রাম, পুনর্গঠন, উন্নয়ন, প্রত্যাশা এবং হতাশার ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রটি গত পাঁচ দশকে বহু রাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকট, উন্নয়ন অভিযাত্রা এবং সামাজিক রূপান্তরের সাক্ষী হয়েছে। এই দীর্ঘ পথচলায় বিভিন্ন সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন এবং বিভিন্ন শাসনব্যবস্থা দেশের গতিপথকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু ইতিহাসের শেষ বিচারে একটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—জনগণ কোন সময়কে কীভাবে স্মরণ করে এবং কেন?
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে। সীমিত সম্পদ, বিধ্বস্ত অবকাঠামো, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও রাষ্ট্রকে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলেছে। কিন্তু সময়টি ছিল চরম প্রতিকূলতার।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক জীবনে এক গভীর অস্থিরতার সূচনা ঘটে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর ধারাবাহিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, সামরিক হস্তক্ষেপ, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশের জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে জাতি এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, যেখানে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক বিভক্তি ক্রমশ গভীর হতে থাকে।
অনেক নাগরিকের স্মৃতিতে এই সময়টি একটি বেদনাদায়ক ও অস্বস্তিকর অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। স্বাধীনতার স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং রাষ্ট্রগঠনের প্রত্যাশার জায়গায় দেখা দেয় উদ্বেগ, অবিশ্বাস ও হতাশা। রাজনৈতিক সংঘাত, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বারবার পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্থিতিশীল জীবনের আকাঙ্ক্ষা আরও প্রবল হয়ে ওঠে। ইতিহাসবিদদের মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে ১৯৭৫-পরবর্তী সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়, যার অভিঘাত বহু বছর ধরে রাষ্ট্র ও সমাজকে প্রভাবিত করেছে।
এই দীর্ঘ অস্থিরতার পর্ব অতিক্রম করেই বাংলাদেশ পরবর্তীকালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং উন্নয়নের নতুন পথ খুঁজতে শুরু করে। ফলে স্বাধীনতার পরবর্তী ইতিহাসকে বুঝতে হলে ১৯৭৫-পরবর্তী এই অধ্যায়কে শুধু ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে নয়, বরং একটি জাতির মানসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাতের সময় হিসেবেও বিবেচনা করতে হয়।
পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব পুরোপুরি দূর হয়নি।
১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে সামরিক শাসনের আরেকটি অধ্যায় শুরু হয়। এরশাদের শাসনামলে উপজেলা ব্যবস্থা চালু, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক যোগাযোগ সম্প্রসারণ, সেচ ব্যবস্থার বিস্তার এবং স্থানীয় সরকার কাঠামো শক্তিশালী করার কিছু উদ্যোগ প্রশংসিত হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা, বিরোধী দলের আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি এবং সামরিক শাসনের বৈধতা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। ফলে উন্নয়ন ও রাজনৈতিক বিরোধ—উভয় বাস্তবতাই এই সময়কে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত অধ্যায়ে পরিণত করেছে।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে এবং গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৯৯১-১৯৯৬ সময়কালে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক সংঘাত, হরতাল, অবরোধ, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ ছিল।
১৯৯৬-২০০১ সময়কাল বাংলাদেশের ইতিহাসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার অগ্রগতি, গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন এবং শিক্ষার বিস্তারে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এসব উদ্যোগ দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে।
২০০১-২০০৬ সময়কালেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলেও রাজনৈতিক সংঘাত, জঙ্গিবাদ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক ছিল। এরপর ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা দেখা যায়। তবে একই সঙ্গে অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক স্থবিরতা, অর্থনৈতিক মন্থরতা এবং জনমনে অস্বস্তিও বিরাজ করেছিল।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়কে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নপর্ব হিসেবে বিবেচনা করেন অনেক পর্যবেক্ষক। এ সময়ে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, অসংখ্য ফ্লাইওভার এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে এবং দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে বিদ্যুতের সুবিধা পৌঁছে যায়। ডিজিটাল সেবা, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-গভর্ন্যান্স, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ এবং অনলাইনভিত্তিক নাগরিক সেবার বিস্তার দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনে নতুন মাত্রা যোগ করে।
একই সঙ্গে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং রপ্তানি খাতেও অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচিত করে তোলে। অনেক সাধারণ মানুষ এই সময়কে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, তুলনামূলক স্থিতিশীলতা এবং দৈনন্দিন জীবনের পূর্বানুমেয়তার কারণে ইতিবাচকভাবে স্মরণ করেন।
তবে ২০২৪ সালের পর দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ জনজীবনকে কঠিন করে তোলে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ প্রকাশ পেতে থাকে। ফলে অনেক মানুষ বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে অতীত সময়ের তুলনা করতে শুরু করেন।
এই তুলনার মধ্য দিয়েই জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা দৃশ্যমান হয়। সমাজের একটি অংশ ২০০৯-২০২৪ সময়কালকে শুধু কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবেও স্মরণ করে। তাদের কাছে সেই সময় মানে ছিল অব্যাহত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, তুলনামূলক নিরাপত্তাবোধ, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি নির্দিষ্ট আস্থা। বর্তমানের নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে অনেক মানুষের মনে সেই সময়ের স্মৃতি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।
ফলে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে প্রায়ই একটি প্রশ্ন উচ্চারিত হচ্ছে—যে সময়কে তারা উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখেছেন, সেই সময়ের বৈশিষ্ট্যগুলো কি আবার ফিরে আসতে পারে? এই আকাঙ্ক্ষা মূলত কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি আবেগের চেয়ে বেশি, বরং নিরাপদ জীবন, ক্রয়ক্ষমতা, সামাজিক শৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশার প্রতিফলন।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো—কোনো সরকার, দল বা ব্যক্তির স্থায়িত্ব নয়; স্থায়ী হয় জনগণের অভিজ্ঞতা। জনগণ শেষ পর্যন্ত সেই সময়কেই মনে রাখে, যখন তারা নিজেদের জীবনকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ, কর্মমুখর এবং আশাব্যঞ্জক বলে অনুভব করে। রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য সেখানেই—যেখানে উন্নয়নের সুফল কেবল পরিসংখ্যানে নয়, মানুষের প্রতিদিনের জীবনে প্রতিফলিত হয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটিই: আমরা কি এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারব, যেখানে উন্নয়ন, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার এবং জনকল্যাণ পরস্পরের পরিপূরক হবে? কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত স্থাপনা নয়, মানুষের জীবনকেই বিচার করে; আর জনস্মৃতি সবসময় সেই সময়কেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে, যে সময় মানুষকে আশা করতে শিখিয়েছে।

