“হৃদয় হরন’ এর লেখা থেকে-
একদিন ইতিহাস তার ধুলোমাখা ট্রাঙ্ক খুলে
একটা পরিবারকে বের করে আনবে—
নাম তার হামিদ পরিবার।
কেউ বলবে, এরা ছিলো ঐতিহ্যের শেষ প্রদীপ,
কেউ বলবে, এরা নিজের হাতেই নিজেদের বংশলতিকা পুড়িয়ে ছাই করেছে।
কারিনার দাদু এম এ হামিদ—
যুদ্ধের পর পাকিস্তান ফেরত এক কর্ণেল,
জিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু,
তবু মতের অমিলে বিদায় নিতে হয়েছিলো সেনাবাহিনী থেকে।
একটা সময় ছিলো,
মানুষ বিশ্বাস করতো—
মেরুদণ্ডও একধরনের উত্তরাধিকার।
তারপর এলেন রানী হামিদ—
চোখে দাবার ছক,
মাথায় দেশের পতাকা,
বয়সকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে এখনও বোর্ডের সামনে বসেন।
তিনি চাল দেন,
আর সময় হার মানে।
তারপর কায়সার হামিদ—
বাংলাদেশের মাঠে যার পায়ের ছোঁয়ায়
ফুটবলও কখনো কখনো কবিতা হয়ে উঠতো।
স্টেডিয়ামের গ্যালারি তাকে দেখলে
হুইসেল না, দোয়া দিতো।
আর কারিনা—
নিজের শরীরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে
মানুষকে হাসানোর চেষ্টা করেছে।
এটাও কম সাহস না।
কারণ এই দেশে মানুষ মোটা শরীর মাফ করে না,
কিন্তু নিষ্ঠুরতা সহজে মাফ করে দেয়।
তবু ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর।
সে বংশের অর্জন গুনে না,
শেষ দৃশ্যটাই বেশি মনে রাখে।
একদিন কায়সার হামিদ “নিউওয়ে” নামে
স্বপ্ন বিক্রির দোকান খুললেন—
মানুষ টাকা দিলো ভবিষ্যৎ কিনবে বলে,
ফিরে পেলো প্রতারণার রসিদ।
জেলখানার দেয়ালে তখনও হয়তো
কোনো পুরোনো ফুটবল ম্যাচের প্রতিধ্বনি লেগে ছিলো।
তারপর এলো পাঁচ আগস্ট।
গণভবনের ভাঙা দরজার সামনে
কেউ ইতিহাস লিখছিলো না,
সবাই শুধু লুটের মাল গুনছিলো।
সেই ভিড়ের মধ্যেও হামিদ পরিবার ছিলো—
ঐতিহ্যের শেষ জানাজায় নিজেরাই কাঁধ ধরেছিলো তারা।
কারিনা,
তুমি শেখ হাসিনার পাশে বসে ছবি তুলেছিলে—
ক্ষমতার খুব কাছে গিয়েছিলে।
এই দেশে ক্ষমতার পাশে বসা সহজ,
কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানো ভয়ংকর কঠিন।
যে ছেলেরা একুশে আগস্টে বুক পেতে দিয়েছিলো,
যারা গুলির সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ বাঁচাতে চেয়েছিলো,
তাদের ভাগ্যে একটা ছবিও জোটেনি।
ইতিহাস সবসময় ক্যামেরাম্যানদের পক্ষ নেয় না।
আজ তুমি মৃত্যুশয্যায়।
জীবন এখন তোমার শরীরের সাথে দরকষাকষি করছে।
তোমার বাবা মানুষের সাহায্য চাইছেন—
এই মানুষগুলোর কাছেই,
যাদের একসময় বোকা বানানো হয়েছিলো,
যাদের কষ্ট নিয়ে রাজনীতি হয়েছিলো,
যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উল্লাস হয়েছিলো।
তবু আমি চাই তুমি বেঁচে থাকো।
কারণ মৃত্যু খুব সহজ শাস্তি।
বেঁচে থাকা কঠিন।
বেঁচে থেকে দেখো—
কীভাবে একটা দেশ ধীরে ধীরে জ্বরে কাঁপে,
কীভাবে “হাম” জাদুঘরের রোগ হয়েও
আবার শিশুর কফিনে ফিরে আসে,
কীভাবে ভুল সিদ্ধান্তের আগুনে
অসংখ্য বাবা-মায়ের কোল খালি হয়।
বেঁচে থাকো কারিনা,
কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অভিশাপ মৃত্যু না—
নিজের ভুলের ভেতর বেঁচে থাকা।

