রুপসীবাংলা৭১ অন্যান্য ডেস্ক : মানবসভ্যতার সূচনা থেকেই সত্য-মিথ্যার তর্ক-বিতর্ক চলছে। আর এসব তর্ক-বিতর্ক যুগে যুগে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও নৈতিকতার জন্য এক অনন্ত শিক্ষা হয়ে আছে। ইবরাহিম (আ.) ও জালিম শাসক নমরুদের মধ্যে সংঘটিত বিতর্ক তেমনই এক অনন্য ঘটনা। এটি শুধু একজন নবী ও এক অহংকারী রাজার কথোপকথন নয়; বরং এটি সত্য-মিথ্যা, তাওহিদ-শিরক, বিনয় ও অহংকারের স্পষ্ট দ্বন্দ্ব।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘তুমি কি সে ব্যক্তিকে দেখনি, যে ইবরাহীমের সাথে তার রবের ব্যাপারে বিতর্ক করেছে যে, আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছেন?’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৮)
এখানেই নমরুদের চরিত্র উন্মোচিত হয়—ক্ষমতার অহংকার। রাজত্ব ও প্রভাব-প্রতিপত্তি তাকে এমন এক ভ্রান্ত ধারণায় নিমজ্জিত করেছিল, যেখানে সে নিজেকে সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে, এমনকি স্রষ্টার সমকক্ষ ভাবতে শুরু করে। তখন ইবরাহিম (আ.) অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর একটি যুক্তি উপস্থাপন করেন। ‘ইবরাহিম (আ.) বলেন, আমার প্রতিপালক তিনিই, যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান।
’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৮)
এটি ছিল একটি মৌলিক সত্য—জীবন ও মৃত্যুর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ শুধু আল্লাহরই। এই যুক্তির মাধ্যমে তিনি স্রষ্টার সর্বময় ক্ষমতা ও একত্ববাদকে অত্যন্ত সরলভাবে তুলে ধরেন। কিন্তু নমরুদ, যে ইতিমধ্যেই অহংকারে অন্ধ হয়ে পড়েছিল, সে চিরন্তন এই সত্যকে বিকৃত করার চেষ্টা করে। সে দাবি করে বসে, ‘আমিও জীবন দান করি এবং মৃত্যু ঘটাই।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৮)
তার এই কথার পেছনে কোনো প্রকৃত শক্তি বা বাস্তবতা ছিল না; বরং এটি ছিল শুধু যুক্তির অপপ্রয়োগ। এমনকি সে তখন সে একজন বন্দিকে ডেকে এনে হত্যা করে এবং আরেকজনকে মুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চায় যে, জীবন ও মৃত্যু তার হাতেই। অথচ এটি ছিল নিছক প্রতারণা—জীবন সৃষ্টি বা প্রকৃত মৃত্যু ঘটানোর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই নেই। ইবরাহিম (আ.) তখন বুঝতে পারলেন যে এই ব্যক্তির সঙ্গে সরল যুক্তিতে আলোচনা করলে সে সত্যকে গ্রহণ করবে না। তাই তিনি এমন একটি যুক্তি উপস্থাপন করলেন, যা একেবারেই অখণ্ডনীয় এবং যার কোনো বিকল্প ব্যাখ্যা দেওয়া অসম্ভব।
‘তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন; তুমি সেটিকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করে দেখাও।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৮)
এই চ্যালেঞ্জ ছিল এমন এক বাস্তবতা, যা প্রতিদিন মানুষের চোখের সামনে ঘটে এবং যা পরিবর্তন করার ক্ষমতা কারো নেই। সূর্যের উদয় ও অস্ত আল্লাহর সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন—এটি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে নমরুদ এ যুক্তির কোনো জবাব দিতে পারে না। কোরআনের ভাষায়, ‘এতে কাফির ব্যক্তি হতবুদ্ধি হয়ে গেল।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৮)
এই ঘটনাটি আমাদের সামনে সত্যের এক অনন্য শক্তি তুলে ধরে। ইবরাহিম (আ.)-এর যুক্তি ছিল সহজ, স্বাভাবিক এবং বাস্তবভিত্তিক। অন্যদিকে নমরুদের বক্তব্য ছিল কৃত্রিম, অহংকারনির্ভর এবং বাস্তবতাবিবর্জিত। তাই শেষ পর্যন্ত সত্যই বিজয়ী হয়েছে এবং মিথ্যা পরাজিত হয়েছে। তাই মানুষ যখন ক্ষমতা, সম্পদ বা প্রভাবের কারণে নিজেকে বড় মনে করতে শুরু করে, তখন সে সহজেই সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। অহংকার মানুষের বিবেককে অন্ধ করে দেয় এবং তাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে সে স্পষ্ট সত্যকেও অস্বীকার করতে দ্বিধা করে না। নমরুদ তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। অন্যদিকে ইবরাহিম (আ.) আমাদের শেখান কিভাবে দৃঢ় বিশ্বাস, প্রজ্ঞা ও যুক্তির মাধ্যমে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। তিনি কখনো উত্তেজিত হননি, অহংকার প্রদর্শন করেননি; বরং ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও সঠিক সময়ে সঠিক যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে সত্যকে উপস্থাপন করেছেন।
রুপসীবাংলা৭১/এআর

