নিজস্ব প্রতিনিধি ঃ
আজ শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, সকাল ১০.৩০ জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে নোঙর ট্রাস্ট আয়োজিত ‘গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি এবং অভিন্ন নদীতে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় বক্তারা ভারত ও মিয়ানমার থেকে প্রবাহিত ৫৭টি অভিন্ন নদীতে বাঁধ দেয়ার কারণে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিভিন্ন দিকগুলো তুলে ধরেন। চুক্তি থাকার পরও প্রায়ই অভিযোগ ওঠে যে, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত পানির হিস্যা পাচ্ছে না। এর বড় কারণ নদীর উজানে ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার। ফারাক্কায় আসার আগেই যদি পানি সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে চুক্তির গাণিতিক সূত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে।
গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ নিয়ে বক্তারা বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের জন্য ভবিষ্যতে এ চুক্তি নবায়নের পাশাপাশি স্থায়ী চুক্তির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, শুধু গঙ্গা নদী ছাড়াও অভিন্ন ৫৭ টি নদীর বিষয়ে একটি অভিন্ন ও সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের উপর প্রবাহিত অভিন্ন নদীগুলোর ভারতীয় অংশে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহারের সমালোচনা করে বক্তারা উল্লেখ করেন, এর ফলে পরিবেশ বিপর্যয় এবং মরুকরণ প্রক্রিয়ায় ভাটির দেশ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এর বাস্তুতন্ত্র। ফলে কৃষি, মৎস, বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
নোঙর ট্রাস্ট এর সভাপতি সুমন শামস এর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব হাবিবুর রশিদ এমপি।
তিনি বলেন ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তির মূল লক্ষ্যই ছিল শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা। তবে সময়ের সাথে সাথে জলবায়ু পরিবর্তন এবং উজানে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় আমাদের প্রাপ্তিতে যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, তা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। সরকারের পক্ষ থেকে আমরা সবসময়ই এই চুক্তিকে আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী কার্যকর রাখার দাবি জানিয়ে আসছি।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৭টি অভিন্ন নদী রয়েছে। আমরা চাই প্রতিটি নদীর ক্ষেত্রেই একটি স্থায়ী এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পন্ন পানি বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। তিস্তা চুক্তি থেকে শুরু করে অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার তার ন্যায্য পাওনার দাবিতে অনড়। আমরা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রেখে আমাদের পানির অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছি।
আমি একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই পানির প্রবাহ ঠিক না থাকলে আমাদের অবকাঠামোও হুমকির মুখে পড়ে। শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে গেলে যেমন নাব্যতা হারায়, তেমনি বর্ষায় অতিরিক্ত পানির চাপে আমাদের রেললাইন ও সড়কপথের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তাই নদী শাসনের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পানির প্রবাহ সচল রাখা আমাদের সামগ্রিক উন্নয়নের অংশ।
সভায় মূল প্রবন্ধে সুমন শামস বলেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার ফল নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত আন্তঃসীমান্ত বা অভিন্ন নদীগুলোর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও ন্যায্যতার প্রশ্ন। তাই আজ সময় এসেছে স্পষ্ট করে বলার অভিন্ন নদী মানে অভিন্ন দায়। কিন্তু দায় কেবল উজানের নয়, ভাটিরও আছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নদী দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত ড্রেজিং, এবং খাল-নালার অবহেলা আমাদের নিজেদের তৈরি করা সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এক সময়ের জীবন্ত খালগুলো আজ আবর্জনার ভাগাড় বা দখলদারিত্বের শিকার। ফলে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, জলাবদ্ধতা বাড়ছে, নদীর সঙ্গে খালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এই অবস্থায় অভিন্ন নদীর ন্যায্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, তথ্য বিনিময়, যৌথ নদী কমিশনের সক্রিয়তা—এসবকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক নদী আইন ও ন্যায্য ব্যবহার নীতিকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে আরও দৃঢ় ও কৌশলগত অবস্থান নিতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটরে মহাপরিচালক জনাব এস এম আবু হোরায়রা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হবে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি ১২ ডিসেম্বর ২০২৬-এ নির্ধারিত সময়কাল পূর্ণ হবে। বর্তমানে চুক্তিটি নবায়নের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা ও যৌথ কারিগরি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এ সময় নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক, প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান বলেন, গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হবে। নতুন করে চুক্তির নবায়ন বা সংস্কারের ক্ষেত্রে আমাদের কিছু বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন: চুক্তিতে এমন একটি ধারা থাকা প্রয়োজন যাতে পানির প্রবাহ কম থাকলেও বাংলাদেশ একটি ন্যূনতম পরিমাণ পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা পায়। শুধু গঙ্গা নদী নয়, ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনার জন্য বেসিন-ভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করা। দুই দেশের মধ্যে পানির প্রবাহ সম্পর্কিত তথ্যের আদান-প্রদান আরও স্বচ্ছ এবং রিয়েল-টাইম হওয়া জরুরি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত জনাব মসয়ুদ মান্নান বলেন, আন্তঃসীমান্ত নদী গঙ্গা তথা পদ্মা নদী কেবল একটি জলস্রোত নয়, এটি আমাদের কৃষি, অর্থনীতি ও বাস্তুসংস্থানের মেরুদন্ড। ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ছিল দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকটের একটি কূটনৈতিক সমাধান।
রিভারাইন পিপলের মহাসচিব জনাব শেখ রোকন বলেন, বাংলাদেশের চারটি বেসিন-কে কেন্দ্র করে অভিন্ন নদী সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালার প্রণয়নের করতে হবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে প্রবেশ করা আন্তঃসীমান্ত নদী মূলত এক বা একাধিক দেশের রাজনৈতিক সীমান্ত অতিক্রম করে বয়ে চলা নদী। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ২৬০টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে ভারত এবং মিয়ানমারের সাথে ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে যার বেশিরভাগই জাতীয় সীমান্ত অতিক্রম করেছে।
সভায় আরো বক্তব্য রাখেন ড. মোঃ আব্দুল ওয়াহাব, জনাব তোফায়েল আহম্মেদ, জাকিয়া শিশির, মিহির বিশ্বাস, নাজির আহমেদ সিমাব, মিস নাহিদা আশরাফী, ফরিদুল ইসলাম, আলাউদ্দিন আহমেদ এবং সামসুজ্জামান খান।
সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নোঙর ট্রাস্ট এর সাধারণ সম্পাদক জনাব আবদুর রাহিম এবং আন্তঃসীমান্ত নদী সংকলনের মোড়ক উম্মোচন ঘোষণা করেন নোঙর ট্রাস্টি ফজলে সানি। এসময় উপস্থিত ছিলেন নোঙর সদস্য, আমিনুল হক চৌধুরী, বদরুল সরদারসহ বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিবৃন্দ।

