নিজস্ব প্রতিনিধি ঃ
আগামী ২৭ ও ২৮ চৈত্র ১৪৩২। ১০ ও ১১ এপ্রিল ২০২৬ জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ্ এর চুয়াল্লিশতম বার্ষিক অধিবেশন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এবারের সম্মেলনের প্রধান অতিথি নাট্যশিল্পী ফেরদৌসী মজুমদার। রবীন্দ্রপদক দিয়ে গুণি-সম্মাননা জানানো হবে গুণী অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন কে।
দুই দিনের চুয়াল্লিশতম বার্ষিক অধিবেশনে সহায়তা দিচ্ছে ঐঝইঈ, কাজী ফার্মস, চ্যানেল আই, কণ্ঠশীলন, এক্সেল একাডেমি, ঘঙকওঅ, ওফবধষ ঊষবপঃৎরপধষ ঊহঃবৎঢ়ৎরংব খঃফ. চৎড়মৎবংং এৎড়ঁঢ়, পূবালী ব্যাংক ছায়ানট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং আরো অন্য সহযোগী। এবারের আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন দেশের নানা অঞ্চল থেকে সমাগত সাতশতাধিক শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক।
১০ এপ্রিল উদ্বোধন সকাল দশটায় বোধন সঙ্গীত ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব’ এই গানের মধ্য দিয়ে। ৯ এপ্রিল প্রতিযোগিতার বাছাই পর্ব। প্রতিটি শাখায় প্রতিযোগিতার পর প্রায় চারশতাধিক প্রতিযোগী আগামী ৯ এপ্রিল ঢাকায় বাছাই পর্বে অংশগ্রহণ করবেন। এখান থেকে চূড়ান্ত প্রতিযোগী বাছাই করা হবে। জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রতিযোগিতার কিশোর ও সাধারণ বিভাগের চূড়ান্তপর্ব ১০ এপ্রিল সকাল ১০:৪০ মিনিটে হবে একই সঙ্গে দুইমঞ্চে। দুই দিনেরই সান্ধ্য-অধিবেশন সাজানো হয়েছে গুণীজনের সুবচন, গীতিআলেখ্য, আবৃত্তি, নৃত্য ও গান দিয়ে। ৪৪তম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন সকাল সাড়ে এগারোটায় আছে সেমিনার। এবারের বিষয়: ‘‘বিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সঙ্গীত’’। সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সভাপতি মফিদুল হক। আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন অধ্যাপক কৃষ্টি হেফাজ, অধ্যাপক সন্তোষ ঢালি, ফেরদৌস আরা লিপি ও স্বতন্ত্রা বুলবুল। প্রথম দিনের সান্ধ্যকালীন অধিবেশনের একটি পর্ব থাকছে নজরুল সঙ্গীতের।
থাকছে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ্ – এর এ যাবৎকাল পরিচালিত কার্যক্রমের উপস্থাপনা। বার্ষিক অধিবেশন উপলক্ষে যথারীতি প্রকাশিত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির নানা দিক নিয়ে বিশিষ্টজনদের লেখা প্রবন্ধের সংকলন ‘সঙ্গীত সংস্কৃতি’।
১৯৭৯ সালে শিল্পী জাহিদুর রহিমের প্রয়াণ-দিবসে কাজ শুরু হয়েছিল ‘জাহিদুর রহিম স্মৃতি পরিষদ’-এর। দেশব্যাপী বৃহত্তর পরিসরে কর্মকান্ড পরিচালনা করার লক্ষ্য নিয়ে পরবর্তীকালে বাঙালির চিরকালের সঙ্গী রবীন্দ্রনাথের নাম যুক্ত করে সংগঠনের নাম করা হয় জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ্। মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে সকল প্রকার প্রতিবন্ধকতা দূর করে বাঙালির জাতীয় সংস্কৃতির সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক বিকাশের ধারাকে সমৃদ্ধ ও গতিশীল করে তোলার উদ্দেশ্যে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করা। নাম পরিবর্তন হলেও অব্যাহত আছে প্রয়াত স্মরণীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী জাহিদুর রহিমের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ‘জাহিদুর রহিম স্মৃতি পুরস্কার’ প্রতিযোগিতার আয়োজন।
প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকের বার্ষিক অধিবেশনগুলো কেবল রাজধানী ঢাকাতেই হত। শাখাগুলিকে উদ্বুদ্ধ করতে এবং সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপকতর প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালে নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বার্ষিক অধিবেশন হচ্ছে- এক বছর ঢাকায়, পরের বছর অন্য জেলায়। সঙ্গীত প্রতিযোগিতার আয়োজন হচ্ছে এক বছর পর পর, কেবল ঢাকার অধিবেশনে। প্রতি অধিবেশনেই দেশের সেবাব্রতী গুণীদের সম্মাননা জানিয়ে আমরা নিজেরাই ধন্য হই। নির্বাচিত গুণীকে রবীন্দ্র-পদক ও সাধ্যমত অর্থ প্রদান করা হয়ে থাকে। বর্তমানে জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সক্রিয় শাখা ৮২টি।
জীবন-সায়াহ্নে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গভীর পরিতাপ ও ক্ষোভ নিয়ে প্রত্যক্ষ করেছিলেন পাশ্চাত্য তথা ইউরোপীয় সভ্যতার শক্তিরূপের আস্ফালন ও মুক্তিরূপের বিপর্যয়। বর্তমান আধিপত্যবাদী বিশে^ পশ্চিমা মার্কিনী সভ্যতা ও তৎসঙ্গীদের ক্ষমতা মদমত্ত হিংস্রতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি গাজার ধ্বংসস্তূপে, ইরানের বিরুদ্ধে বর্বর আক্রমণে, যা সভ্য সমাজের রীতিনীতি পদপিষ্ট করে জন্ম দিয়েছে সভ্যতার অতলস্পর্শী সংকটের। এমনি রূঢ় বাস্তবতায় মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ^াস করাকে একদা রবীন্দ্রনাথ অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছিলেন, সেই অমানিশার অবসানে তিনি আস্থা রেখেছিলেন মানুষের ওপর। সভ্যতার সুকৃতি-বিনাশী হিংসায় উন্মত্ত বাস্তবতা যেমন আন্তর্জাতিক, তেমনি জাতীয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্প্রীতির বন্ধন ছিন্ন করে ঘৃণা ও সহিংসতা উস্কে দেয়ার প্রয়াস দেশে, উপমহাদেশে, বিশে^ আজ প্রবল হয়ে উঠেছে। ধর্মের নামে, গোত্র কিংবা গোষ্ঠী কিংবা আত্মম্ভরী সভ্যতার নামে চলে হিংসা ও ধ্বংসের শক্তির আরাধনা। এই অমানিশা ঘুচিয়ে জাগরণের শক্তি মানুষেই সুপ্ত রয়েছে, মনুষ্যত্বের আবাহনে যার স্ফূরণ আমরা দেখি।
দুঃসময়ের মুখোমুখি হয়ে শিক্ষায়-সংস্কৃতিতে-সঙ্গীতে-শিল্পে মানুষের অন্তরের শক্তি জাগ্রত ও সংহত করার ব্রত নিয়ে আমরা আবারও মিলিত হচ্ছি রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলনে, এই মিলনমঞ্চে সবারে করি আহ্বান।

