নিজস্ব প্রতিনিধি : ফেব্রুয়ারির মৃদু হিমেল হাওয়ায় কান পাতলে এখন শীতের বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি ও শোনা যায়। বাতাসে একইসঙ্গে
বইছে ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী বার্তা । প্রকৃতির পালাবদলের এমন সন্ধিক্ষণে ১২ তারিখের ঐতিহাসিক
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। দিনটি ঘিরে মনের ভেতরে আশার প্রদীপের পাশাপাশি এক দীর্ঘশ্বাসের ছায়াও খেলা
করছে।
বাংলাদেশের বিগত ১২টি নির্বাচনের চড়াই-উতরাই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। হাতেগোনা তিন-চারটা জাতীয়
নির্বাচন বাদ দিলে বাকিগুলোর ইতিহাস মূলত বিতর্ক আর অগ্রহণযোগ্যতার কালিতে লেখা। স্মৃতিপটে ভেসে
ওঠে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সেই দিনটি। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে কোনো ভোটই হয়নি—প্রার্থীরা
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার
প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেকেই জানতে পেরেছিলাম, আমাদের ভোট আগের রাতেই অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে এমনকি
মৃত ব্যক্তির ভোট ও জালিয়াতি করে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। একরাশ ঘৃণা ও অভিমান নিয়ে সেদিন ভোটকেন্দ্র থেকে
ফিরে এসেছিলাম; তারপর থেকে আর ভোটকেন্দ্রমুখী হওয়া হয়নি।
উন্নত বিশ্বে ভোট কেমন হয় তা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৩ শে মার্চের কথা।
অস্ট্রেলিয়ায় তখন জাতীয় নির্বাচন। আমি সিডনিতে ছিলাম। নিউ সাউথ ওয়েলস (NSW) স্টেটের নির্বাচনের সেই
স্মৃতি আজও অমলিন। নিউ সাউথ ওয়েলসের রাজধানী সিডনির দেয়ালে কাগজের পোস্টারের ঘিঞ্জি চোখে পড়েনি,
নির্বাচনী শব্দ দূষণ-বিকট মাইকিং, পথ অবরোধ করে নির্বাচনী প্রচার, বা চোখে পড়েনি ট্যাগিংয়ের রাজনীতি।
লিবারেল ও লেবার পার্টির প্রার্থীদের প্রায়ই একসাথে ভোট চাইতে দেখা যায়। একে অপরের দিকে কোনো কাদা
ছোড়াছুড়ি নয়; বরং উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে সবাইকে মুখিয়ে থাকতে দেখেছি।
অস্ট্রেলিয়ায় ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক, না দিলে জরিমানা দিতে হয়। অথচ আমাদের দেশে ভোট দিতে যাওয়াটাই
যেন এক ‘সাহসী যুদ্ধ’। উন্নত দেশে মানুষের কাছে নির্বাচন মানে সেবার সুযোগ খোঁজা, আর আমাদের অনেক
প্রার্থীর কাছে নির্বাচন যেন এক ‘লাভজনক ব্যবসা’। শিক্ষার হার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও মাথাপিছু আয়ে
আমরা হয়তো এগোচ্ছি, কিন্তু সুস্থ রাজনৈতিক চর্চায়, মন-মানসিকতায় আমরা কতটা দরিদ্র, তা বিদেশের ওই
ভোটকেন্দ্রগুলোতে না গেলে অনুধাবন করা কঠিন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের হৃদয়ে নতুন করে স্বপ্ন বোনার সাহস যুগিয়েছে। মানুষ এখন কেবল ক্ষমতার
পরিবর্তন চায় না, বরং একটি ‘সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ ও ‘নতুন বাংলাদেশ’ এর জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। ‘২৪
এর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী বিপ্লব আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা দেখেছি, ক্ষমতার মোহ কীভাবে
মানুষকে অন্ধ করে দেয়, দেশ কীভাবে রসাতলে চলে যায়। তাই ১২ই ফেব্রুয়ারি আমাদের জন্য কেবল একটি তারিখ
নয়, এটি একটি পরীক্ষা—আমাদের জাতিগত বোধোদয়ের দিন।
অস্ট্রেলিয়ার সেই সুশৃঙ্খল পরিবেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের শুরু হতে পারে এই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের
মাধ্যমেই । আসুন অতীতের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো পেছনে ফেলে ১২ তারিখ আমরা একটি পরিবর্তনের
লক্ষ্যে ভোট কেন্দ্রে যাই। আমাদের একটি ভোটই পারে একজন সত্যিকারের যোগ্য ও দেশপ্রেমিক প্রার্থীকে
নির্বাচিত করতে। আগামী পাঁচ বছর যেন কোনো আক্ষেপের নয়, বরং গৌরবের সাথে মাথা উচু করে বাচার সময়
হয়ে ওঠে। আমি বিশ্বাস করি, দেশের মানুষ এবার দলান্ধ হয়ে ভোট দেবে না। তারা ভোট দেবে যোগ্যতা, সততা ও
দেশপ্রেম দেখে। সঠিক নেতৃত্বে আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশকে দুর্নীতির অভিশাপ থেকে মুক্ত করা সম্ভব। আসুন
পরিবর্তনের জন্য হ্যাঁ-কে জয়যুক্ত করি। গড়ে তুলি বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতির নতুন বাংলাদেশ।

