রুপসীবাংলা৭১ অন্যান্য ডেস্ক : রমজানের রোজা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। ঈমান, সালাত ও যাকাতের পরই রোজার স্থান। রোজার আররি শব্দ সাওম, যার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। পরিভাষায় সাওম বলা হয়—প্রত্যেক সজ্ঞান, বালেগ মুসলমান নর-নারীর সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার নিয়তে পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও রোজাভঙ্গকারী সব কাজ থেকে বিরত থাকা।
সুতরাং রামজান মাসের চাঁদ উদিত হলেই প্রত্যেক সুস্থ, মুকীম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং হায়েজ-নেফাসমুক্ত প্রাপ্তবয়স্কা নারীর ওপর রোজা রাখা ফরজ। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন-
فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ
সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই এ মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই রোজা রাখে। (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ فَإِنْ غُبِّيَ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا عِدَّةَ شَعْبَانَ ثَلاَثِينَ
তোমরা চাঁদ দেখে সিয়াম আরম্ভ করবে এবং চাঁদ দেখে ইফতার করবে।
আকাশ যদি মেঘে ঢাকা থাকে তাহলে শা‘বানের গণনা ত্রিশ দিন পুরা করবে।(বুখারি, হাদিস : ১৯০৯)
উল্লেখিত আয়াত ও হাদিসের আলোকে প্রমাণিত যে, রমজান মাসের রোজা রাখা ফরয, ইসলামের আবশ্যক বিধানরূপে রোজা পালন করা ও বিশ্বাস করাও ফরজ।
তাছাড়া কোনো শরয়ী ওযর ছাড়া কোন মুসলমান যদি রমজান মাসের একটি রোজাও ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করে তাহলে সে বড় পাপী ও জঘন্য অপরাধীরূপে গণ্য হবে। দ্বীনের মৌলিক বিধান লঙ্ঘনকারী ও ঈমান-ইসলামের ভিত্তি বিনষ্টকারী হিসেবে পরিগণিত হবে।
হাদিস শরিফে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ত্যাগকারী ও ভঙ্গকারীর জন্য কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।
আবু উমামা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
وَعَنْ أَبِيْ أُمَامَةَ الْبَاهِلِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَا أَنَا نَائِمٌ إِذْ أَتَانِي رَجُلَانِ فَأَخَذَا بِضَبْعَيَّ فَأَتَيَا بِي جَبَلا وَعْرًا فَقَالَا : اصْعَدْ فَقُلْتُ : إِنِّي لَا أُطِيقُهُ فَقَالَا : إِنَّا سَنُسَهِّلُهُ لَكَ فَصَعِدْتُ حَتَّى إِذَا كُنْتُ فِي سَوَاءِ الْجَبَلِ إِذَا بِأَصْوَاتٍ شَدِيدَةٍ فَقُلْتُ : مَا هَذِهِ الْأَصْوَاتُ قَالُوا : هَذَا عُوَاءُ أَهْلِ النَّارِ ثُمَّ انْطَلَقَا بِي فَإِذَا أَنَا بِقَوْمٍ مُعَلَّقِينَ بِعَرَاقِيبِهِمْ مُشَقَّقَةٍ أَشْدَاقُهُمْ تَسِيلُ أَشْدَاقُهُمْ دَمًا فَقُلْتُ : مَنْ هَؤُلَاءِ قَالَا : هَؤُلَاءِ الَّذِينَ يُفْطِرُونَ قَبْلَ تَحِلَّةِ صَوْمِهِمْ
আবূ উমামা বাহেলী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একদা আমি ঘুমিয়ে ছিলাম; এমন সময় (স্বপ্নে) আমার নিকট দুই ব্যক্তি উপস্থিত হলেন। তাঁরা আমার উভয় বাহুর ঊর্ধ্বাংশে ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ের নিকট উপস্থিত করলেন এবং বললেন, আপনি এই পাহাড়ে চড়ুন। আমি বললাম, এ পাহাড়ে চড়তে আমি অক্ষম। তাঁরা বললেন, আমরা আপনার জন্য চড়া সহজ করে দেব।
সুতরাং আমি চড়ে গেলাম। অবশেষে যখন পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে পৌঁছলাম তখন বেশ কিছু চিৎকার-ধ্বনি শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞাসা করলাম এ চিৎকার-ধ্বনি কাদের? তাঁরা বললেন, এ হল জাহান্নামবাসীদের চীৎকার-ধ্বনি। পুনরায় তাঁরা আমাকে নিয়ে চলতে লাগলেন। হঠাৎ দেখলাম একদল লোক তাদের পায়ের গোড়ালির উপর মোটা শিরায় (বাঁধা অবস্থায়) লটকানো আছে, তাদের কেশগুলো কেটে ও ছিঁড়ে আছে এবং কশবেয়ে রক্তও ঝরছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি বললাম, ওরা কারা? তাঁরা বললেন, ওরা হল তারা; যারা সময় হওয়ার পূর্বে-পূর্বেই ইফতার করে নিত। (ইবনে খুযাইমাহ, হাদিস: ১৯৮৬; ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৭৪৯১; হাকেম, হাদিস : ১৫৬৮; সহীহ তারগীব, হাদিস : ১০০৫, ২৩৯৩)
রমজান মাসের একদিন রোজা না রাখলে মানুষ শুধু গুনাহগারই হয় না, ঐ রোযার পরিবর্তে আজীবন রোজা রাখলেও রমজানের এক রোজার যে মর্যাদা ও কল্যাণ, যে অনন্ত রহমত ও খায়ের-বরকত তা কখনো লাভ করতে পারবে না এবং কোনোভাবেই এর যথার্থ ক্ষতিপূরণ আদায় হবে না।
রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস রামাদান। এ মাস সিয়াম সাধনার ও আত্মসংযমের মাস। ধৈর্য, ত্যাগ, সহানুভূতি, সহমর্মিতা অর্জন ও মানবিক গুণাবলী অনুশীলনের মাস। এ জন্য এ মাস অতি পবিত্র। কারণ, এ মাসে মানবজাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য যেমন মহাগ্রন্থ আল-কোরআন নাযিল হয়েছে, তেমনি অন্যান্য আসমানী কিতাবও নাযিল হয়েছে এ মাসেই। এ মাসে রয়েছে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম এক রজনী। কাজেই এই মহিমান্বিত মাসের পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের সকললে অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য।
পবিত্রতা বা সম্মান রক্ষার অর্থ যার ওপর সাওম ফরজ হয়েছে তার তা পালন করা। অধীনস্ত অন্যান্যের সাওম পালনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। সব রকমের অন্যায়, অশ্লীলতা, বেলেল্লাপনা, নোংরামী, চরিত্র বিধ্বংসী ও নৈতিকতা বিরোধী কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা ও অন্যান্যেরও বিরত রাখার চেষ্টা করা।
এই মহিমান্বিত মাসের যথাযথ কদর করা আর তাতে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর গোলামি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা মতো অগ্রিম প্রস্তুতি। সেই প্রস্তুতি কেমন হবে আর কোন কোন ক্ষেত্রে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে; সেসব নিয়েই আমার বক্ষমান প্রবন্ধের আলোচনা। যা কয়েকটি পর্বে পাঠকবৃন্দের সামনে উপস্থাপন করা হবে ইনশা আল্লাহ।
( পরবর্তী পর্ব ২৪ ঘন্টার মধ্যে দেয়া হবে ইনশাআল্লাহ)
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
রুপসীবাংলা৭১/এআর

