রুপসীবাংলা৭১ অন্যান্য ডেস্ক : রাজনীতি মানব সমাজ পরিচালনার একটি অপরিহার্য মাধ্যম। ইসলাম—রাজনীতিকে ধর্মের বাইরে কোনো বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে নয়, বরং এটিকে নৈতিকতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করে। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে ইসলামী রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের মৌলিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াত ইসলামী রাজনীতির একটি সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার হিসেবে বিবেচিত।
এই আয়াতে ক্ষমতা লাভের পর ইসলামী নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র কী ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করবে তার সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। আয়াতে বলা হয়েছে—‘তাদের যদি আমরা জমিনে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই হাতে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৪১)
আয়াতের আলোকে ইসলামী রাজনীতির চারটি মৌলিক ভিত্তি ও একটি নৈতিক পরিণতি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।
১. নামাজ কায়েম করা : ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর মধ্যে নামাজ অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। যে পাঁচটি ভিত্তির ওপর ইসলাম দাঁড়িয়ে আছে এর মধ্যে নামাজ দ্বিতীয়। নামাজ ছাড়া ইসলামের মৌলিকত্ব অসম্ভব। ঈমানের পর ইসলামে নামাজের চেয়ে অধিক গুরুত্ব অন্য কোনো ইবাদত প্রদান করা হয়নি।
ইসলামী রাজনীতির প্রথম অঙ্গীকার হলো নামাজ কায়েম করা। সব মানুষ আসলে নামাজি হয়ে গেলে দেশে কোনো বিশৃঙ্খলাই থাকবে না। কারণ নামাজ মানুষকে অবশ্যই অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখবে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ (মানুষকে) অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে।’(সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)
কাজেই নামাজ শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও আল্লাহভীতির প্রতীক।
যে রাষ্ট্র নামাজকে গুরুত্ব দেয়, সে রাষ্ট্র নৈতিক অবক্ষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকে।
২. জাকাত আদায় : জাকাত ইসলামী অর্থনীতির মৌলিক স্তম্ভ। জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান কমায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অতএব, ইসলামী রাজনীতির ইশতেহারে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রতিশ্রুতি থাকা আবশ্যক। জাকাত ধনীদের সম্পদে গরিবদের অধিকার। জাকাত দানকারীদের নিজ দায়িত্বে জাকাতের সম্পদ জাকাত গ্রহিতাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘এবং তাদের (ধনীদের) ধন-সম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১৯)
৩. সৎ কাজের আদেশ : ‘সৎ কাজের আদেশ’ ইসলামী রাজনীতির গঠনমূলক দিক। ইসলামী রাষ্ট্র শুধু নিষেধের মাধ্যমে নয়, বরং শিক্ষা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সমাজকল্যাণের মাধ্যমে একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তুলতে চায়। সৎ কাজের প্রসার মানে হলো—নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা। এটি ইসলামী রাজনীতিকে ইতিবাচক ও জনমুখী করে তোলে।
৪. অসৎ কাজ থেকে নিষেধ : ইসলামী রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। এর অর্থ হলো— দুর্নীতি, জুলুম, শোষণ ও নৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ইসলামী রাষ্ট্রে আইন হবে ন্যায়ভিত্তিক এবং প্রয়োগ হবে পক্ষপাতহীন। এ দিকটি ইসলামী রাজনীতিকে দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করে তোলে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা আবশ্যক, যারা কল্যাণের দিকে আহবান করবে, মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বারণ করবে। আর তারাই হবে সফল।’ (সুরা : আল-ইমরান, আয়াত : ১০৪)
৫. আল্লাহর কাছে জবাবদিহির চেতনা : আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহর হাতে’—এটি ইসলামী রাজনীতির নৈতিক উপসংহার। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়; এর চূড়ান্ত পরিণাম আল্লাহর হাতে। এই বিশ্বাস শাসকদের অহংকার ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বিরত রাখে এবং রাজনীতিকে ইবাদত ও আমানতের মর্যাদায় উন্নীত করে।
পরিশেষে বলা যায়, সুরা হজের ৪১ নম্বর আয়াতের আলোকে ইসলামী রাজনীতির ইশতেহার হবে এমন একটি নীতিপত্র, যা নৈতিকতায় পরিশুদ্ধ, অর্থনৈতিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক, সামাজিকভাবে কল্যাণমুখী এবং সর্বোপরি আল্লাহভীতিতে পরিচালিত। এই ইশতেহারে ক্ষমতা লাভের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে ক্ষমতা প্রয়োগের দায়বদ্ধতা বেশি গুরুত্ব পায়। তাই ইসলামী রাজনীতি মূলত ক্ষমতার রাজনীতি নয়, বরং এটি মানবকল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের রাজনীতি।
লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রুপসীবাংলা৭১/এআর

