রুপসীবাংলা৭১ অন্যান্য ডেস্ক : ইসলাম শুধু আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ককেই গুরুত্ব দেয় না; বরং মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক তথা হক্কুল ইবাদকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। নামাজ, রোজা, হজ ও অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে; কিন্তু মানুষের প্রতি জুলুম, অপবাদ, গীবত, সম্মানহানি কিংবা অধিকার হরণ করলে সে ইবাদতই কিয়ামতের দিন তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে দুনিয়াতেই হিসাব মিটিয়ে নেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। মানুষের হক এমন এক ঋণ, যা তাওবা করলেও ক্ষমা হয় না, যতক্ষণ না হকদার ক্ষমা করে।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ও ভীতিকর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন—
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لاَ يَكُونَ دِينَارٌ وَلاَ دِرْهَمٌ إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ
আবু হুরাইরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোনো বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ হতে মাফ করিয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যে দিন তার কোনো দ্বীনার বা দিরহাম থাকবে না। সে দিন তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার যুলুমের পরিমাণ তা তার নিকট হতে নেয়া হবে আর তার কোনো সৎকর্ম না থাকলে তার প্রতিপক্ষের পাপ হতে নিয়ে তা তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। (বুখারি, হাদিস : ২৪৪৯)
হাদিসের ব্যাখ্যা
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের বিচারব্যবস্থার একটি ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।
সেদিন কোনো অর্থ, সম্পদ বা সুপারিশ কাজে আসবে না; একমাত্র লেনদেন হবে আমল দিয়ে।
১. “সম্ভ্রমহানি” কেন আলাদা করে উল্লেখ?
ইমাম ইবন হাজার আল-আসকালানি (রহ.) বলেন : ‘মানুষের ইজ্জত ও সম্মান ক্ষুণ্ন করা, গীবত, অপবাদ, অপমান এগুলো এমন যুলুম, যা মানুষ সহজে ক্ষমা করে না’ (ফাতহুল বারী, ৫/১০১) আজকের সমাজে কলম, মাইক, ফেসবুক পোস্ট কিংবা কথার আঘাতে যে সম্ভ্রমহানি হয়। এই হাদিস তার জন্য সরাসরি প্রযোজ্য।
২. দুনিয়াতেই মাফ করিয়ে নেওয়ার তাগিদ
হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন: “আজই” (فَلْيَتَحَلَّلْهُ الْيَوْمَ)।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন: ‘এতে প্রমাণিত হয় যে, হক্কুল ইবাদ আদায়ের ব্যাপারে দেরি করা মারাত্মক পরিণতির কারণ হতে পারে।’ (শরহু সহিহ মুসলিম, ১৬/১৪০)
৩. সেদিনের “দেউলিয়া” অবস্থা
এই হাদিসটি মূলত সেই প্রসিদ্ধ ধারণার সাথে সম্পর্কিত, যাকে অন্য হাদিসে বলা হয়েছে-মুফলিস (দেউলিয়া ব্যক্তি)। ইমাম কুরতুবী (রহ.) তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব আত-তাযকিরা ফি আহওয়ালিল মাওতা ওয়াল আখিরা-তে ‘মুফলিস (দেউলিয়া)’ সংক্রান্ত হাদিস আলোচনা করতে গিয়ে বলেন: ‘প্রকৃত দেউলিয়াত্ব দুনিয়ার সম্পদের অভাব নয়; বরং আখিরাতে মানুষের অধিকার আদায় করতে গিয়ে আমল নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। (আত-তাযকিরা, পৃ. ৩৪৯)
৪. পাপ স্থানান্তরের ভয়াবহতা
হাদিসে বর্ণিত সবচেয়ে ভীতিকর অংশ হলো— ‘যদি জালিমের কোনো নেক আমল না থাকে, তবে মজলুমের গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।’ ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: ‘এটি আল্লাহর ন্যায়বিচারের পরিপূর্ণ প্রকাশ; যেখানে কোনো জুলুম বিনা প্রতিদানে ছেড়ে দেওয়া হবে না।
’ (মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ১৮/৩২১)
এই হাদিস আমাদের শেখায়— ইবাদতের পাশাপাশি আখলাক ও ইনসাফ অপরিহার্য। মানুষের অধিকার হালকাভাবে নিলে কিয়ামতের দিন ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। আজ ক্ষমা চাওয়া অপমান নয়; বরং আখিরাতের মুক্তির পথ। আজ যে জুলুমকে তুচ্ছ মনে হয়, কাল সেটাই হতে পারে মুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
লেখক: প্রবন্ধিক ও অনুবাদক
রুপসীবাংলা৭১/এআর

