নিজস্ব প্রতিনিধি :বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী একটি আদর্শভিত্তিক ও সুসংগঠিত শক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। সরাসরি ক্ষমতায় না থাকলেও তাদের প্রভাব বিভিন্ন সময়ে লক্ষণীয়। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে জামায়াতের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা শুধুমাত্র তাদের অভ্যন্তরীণ কৌশলের ওপর নির্ভর করে না; বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান এবং জনগণের মনোভাব—সবকিছুর সমষ্টিগত ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল।
প্রথমত, সংগঠনের শক্তি ও শৃঙ্খলা জামায়াতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। অন্যান্য দলের তুলনায় তাদের তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠন সুসংগঠিত, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রমের মাধ্যমে কর্মীদের মধ্যে আনুগত্যবোধ এবং দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা হয়। এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সহায়ক।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করাই আজকের রাজনীতিতে দলটির শক্তি বৃদ্ধি করে। শিক্ষা, সমাজসেবা, ত্রাণ ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে তারা সমাজের কাছে দায়িত্বশীল ও নৈতিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করে। নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে এই গ্রহণযোগ্যতা ভোটারদের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তৃতীয়ত, মূলধারার রাজনৈতিক দলের প্রতি জনসাধারণের হতাশা জামায়াতের জন্য একটি সুযোগ সৃষ্টি করে। বড় দলগুলোর দুর্নীতি, জনসেবা ঘাটতি বা গণতান্ত্রিক দুর্বলতার অভিযোগ উঠে এলে মানুষ বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকে। জামায়াত এই শূন্যতা কাজে লাগিয়ে নিজের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান সুসংহত করতে পারে।
চতুর্থত, জোট এবং পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের কৌশল অতীতে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় রাখতে সহায়তা করেছে। এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার পরিবর্তে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণে অংশ নেওয়া, নীতিগত প্রভাব বজায় রাখা এবং সংসদীয় রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখা—এসব কৌশল তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পঞ্চমত, আইন, বৈধতা এবং আন্তর্জাতিক ইমেজ—এই তিনটি দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে অবস্থান স্থায়ী করতে হলে আইনগত সীমাবদ্ধতা, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হয়। ফলে রাজনৈতিক ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিতে নরমতা এবং পরিবর্তনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
এছাড়া, জামায়াতকে ধারণ করে সরাসরি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করার নীতিতে একটি শক্তিশালী থিংকট্যাংক গঠন করা অত্যন্ত কার্যকরী। এর উদ্দেশ্য হবে নির্বাচনী কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রক্ষা। গ্রুপটিতে অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যেমন: সাবেক চৌকশ সচিব এ এফ এম সোলাইমান চৌধুরী, ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিকী, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আমান আল আজমী, মুফতি মাওলানা কাজী ইব্রাহীম।
প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দলীয় পদ বা আনুগত্য যথেষ্ট নয়। নির্বাচনী এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা, পরিচিতি এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা অপরিহার্য। প্রার্থীকে স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে, এলাকায় সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে, যাতে ভোটাররা তাকে বিশ্বাস ও সমর্থন করতে পারে। এই দিকটি উপেক্ষা করলে দলে নেতৃত্ব থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনী ফলাফল আশানুরূপ হবে না।
অতিরিক্তভাবে, রাজনৈতিক ঐক্য সুদৃঢ় করা অপরিহার্য। বর্তমানে ৮ দলীয় জোটের ঐক্য বজায় রাখা, পাশাপাশি নির্বাচনী ও নীতি সমন্বয়ের জন্য কিছু বাছাইকৃত নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে রাজনৈতিক শক্তি কেবল সংখ্যাগতভাবে নয়, নীতিগত ও জনমতের দিক থেকেও বৃদ্ধি পাবে। এই ধরনের সুসংগঠিত জোট কার্যকর সমন্বয়, ভোটার আস্থা বৃদ্ধি এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
পরামর্শমূলকভাবে বলা যায়, জামায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো—
১. সংগঠন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা,
২. সমাজসেবা ও মানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা,
৩. নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীর পরিচিতি ও আস্থা নিশ্চিত করা,
৪. থিংকট্যাংক ও নীতিগত পরিকল্পনা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা,
৫. রাজনৈতিক ঐক্য ও জোট সম্প্রসারণের মাধ্যমে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা।
এভাবে একটি সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত কৌশল বাস্তবায়ন করলে, দলটি রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে এবং দেশের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে গ্রহণযোগ্য অবস্থান অর্জনে সক্ষম হবে।

