রুপসীবাংলা৭১ অন্যান্য ডেস্ক : মানুষের ভেতর দুটি শক্তি কাজ করে—একটি আলোর, অন্যটি অন্ধকারের। আলো তাকে নম্র করে, সত্যের পথে টানে; অন্ধকার তাকে গর্বিত করে, নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় ভাবায়। ঠিক এই অন্ধকারের নাম অহংকার। এটি হৃদয়ের গভীরে জন্ম নেয়, কিন্তু তার ছায়া ছড়িয়ে পড়ে আচরণে, কথায়, দৃষ্টিতে।
অথচ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় গুণ এটাই। ইবনে উমার (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মনে মনে গর্বিত হবে অথবা চলনে অহমিকা প্রকাশ করবে, সে ব্যক্তি যখন আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন তিনি তার উপর ক্রোধান্বিত থাকবেন।’ (বুখারি ৫৪৯, মুসলিম ৬২৩, নাসায়ি ৫০৯, ৫১০, আবু দাউদ ৪১৩, আহমাদ ১১৫৮৮)
অহংকার কেবল একটি আচরণগত ত্রুটি নয়, বরং এটি আখলাকী রোগ, যা হৃদয়ে জন্ম নেয় এবং চরিত্রকে বিকৃত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘তুমি মুখ ফিরিয়ে নিও না মানুষের কাছ থেকে অহংকার করে এবং পৃথিবীতে গর্বভরে চলো না; নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারী ও আত্মগর্বিতদের পছন্দ করেন না।
’ (সুরা লুকমান, আয়াত : ১৮)
ইবনে কাসীর (রহ.) ব্যাখ্যা করেছেন, ‘অহংকার মানে হলো—নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবা, সত্য অস্বীকার করা এবং মানুষের প্রতি তুচ্ছ দৃষ্টি রাখা।’ (তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড ৩, পৃ. ৪৬২)
শয়তান প্রথম অহংকারী। মহান আল্লাহ আদম (আ.)-কে সিজদা করার নির্দেশ দিলে সে অহংকারবশত প্রত্যাখ্যান করেছিল। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: ‘সে (ইবলিস) অস্বীকার করল ও অহংকার করল এবং অবাধ্যদের অন্তর্ভুক্ত হলো।
’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ৩৪)
ইমাম গাযালী (রহ.) লিখেছেন— ‘অহংকার এমন এক পাপ, যার কারণে শয়তান চিরতরে রহমত থেকে বঞ্চিত হয়। যে হৃদয়ে অহংকার জন্মায়, সেখানে ইমানের আলো নিভে যায়।’ (ইহইয়া উলূমিদ্দীন, খণ্ড ৩, অধ্যায়: কিবর)
মহানবী (সা.) নিজে ছিলেন বিনয়ের সর্বোত্তম উদাহরণ। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের কাপড় নিজে সেলাই করতেন, জুতা মেরামত করতেন এবং গৃহস্থালির কাজে সাহায্য করতেন।’ (বুখারি, আদবুল মুফরাদ, হাদিস : ৫৩৮)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে বোঝা যায়, সত্যিকার শ্রেষ্ঠত্ব বিনয়ে নিহিত, আর অহংকার মানেই আল্লাহর ক্রোধকে আহ্বান করা।’ (শরহ নববী ‘আলা সহিহ মুসলিম, খণ্ড ২, পৃ. ৪৬)
ইসলামী পণ্ডিতগণ অহংকারকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন—
এক. আন্তরিক অহংকার: মনে মনে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবা। দুই. আচরণগত অহংকার: চলাফেরা, কথাবার্তা বা পোশাকে গর্ব প্রকাশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘যার অন্তরে অণুমাত্র অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১)
ইবনে রজব হাম্বলী (রহ.) বলেন: ‘অহংকার হলো এমন একটি পর্দা যা আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে; যতক্ষণ এটি থাকবে, বান্দা আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারবে না।’ (জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম, হাদিস ১৩ ব্যাখ্যা)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদায় উচ্চ করবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: ‘বিনয় মানে নিজের মূল্য কম ভাবা নয়; বরং আল্লাহর মহিমা অনুধাবন করে নিজের অবস্থান বুঝে নেওয়া।’ (মাজমু‘ আল-ফাতাওয়া, খণ্ড ১০, পৃ. ২৫৩)
অহংকার এমন এক নীরব আগুন যা মানব চরিত্র, আচরণ ও ঈমানকে ধ্বংস করে। ইসলামী জীবনপথে বিনয়ই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদার মূল চাবিকাঠি।
রুপসীবাংলা৭১/এআর

