রুপসীবাংলা৭১ প্রতিবেদক : ভোর হতে না হতেই জেগে ওঠে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। দিগন্ত ছুঁই ছুঁই নীল সমুদ্র থেকে ভোরের আলো ফুঁড়ে বন্দরে ভেড়ে ইলিশবাহী ট্রলার। একের পর এক ট্রলার ভেড়ে। ট্রলার নোঙর ফেলতেই বন্দরের পুরো আঙিনা কেঁপে ওঠে।
মাছ বিক্রির হাঁকডাকে মুখর হয় বন্দর। কানে ভেসে আসে, ‘ইলিশ, ইলিশ! টাটকা ইলিশ। নদীর ইলিশ। সাগরের ইলিশ।
সুন্দরবনের মটকা চিংড়ি।’ সাগরের লোনা হাওয়া, রোদে চকচক মাছের আঁশ, দাম হাঁকাহাঁকিতে সমুদ্রঘেঁষা জীবন এখানে এখন প্রতিদিনই নতুন রং ছড়ায়। কিন্তু ঝলমলে ইলিশের আড়ালেই আছে অভাবের চিত্র। সাগর থেকে ট্রলারে যে ইলিশ আসছে, সেগুলো আকারে ছোট।
সাগরে ছোট ইলিশের দেখা মিললেও নদীতে জাল ফেলেও তেমন ইলিশ পাচ্ছেন না জেলেরা। অথচ এই সময়েই সীমান্ত পেরিয়ে পাড়ি দেবে এক হাজার ২০০ টন ইলিশ। ওপারে ভারতে ইলিশের উৎসবের উল্লাস, আর এপারে জেলের ঘরে চড়ছে অভিমানের ঢেউ।
খালি জাল, চড়া দাম : ভোলা, বরিশাল, কলাপাড়া, পাথরঘাটা, তালতলীর জেলেরা জানিয়েছেন, নদীতে বড় ইলিশ নেই। জেলেরা দিনরাত সাগরে গেলেও ছোট ইলিশ নিয়ে ফিরছেন, সেখানেও বড় ইলিশের দেখা নেই।
যে ছোট আকারের ইলিশ আহরণ করা হচ্ছে বাজারে তার দাম আকাশছোঁয়া। জানা গেল, আড়তে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার টাকায়, আরো বড় হলে দাম তিন হাজার টাকার বেশি। খুচরা বাজারে ৬০০ গ্রামের ইলিশও প্রায় দেড় হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ৪০০ গ্রামের ইলিশও মিলছে না হাজার টাকার নিচে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, এ মৌসুমে ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ৯০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। গত বছর একই সময়ে তা ছিল ৮০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা। জানা গেছে, এক দশক আগেও ভরা মৌসুমে আধাকেজি থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশের গড় দাম ছিল ৫০০ টাকা। তা বেড়ে এখন হয়েছে কয়েক গুণ। অভিযোগ পাওয়া গেছে, সাগরের ইলিশ ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হচ্ছে নদীর বলে।
ওপারে উল্লাস, এপারে অভিমান : সম্প্রতি ঘোষণা এসেছে, ভারতে রপ্তানি করা হবে এক হাজার ২০০ টন ইলিশ। দুর্গাপূজা ঘনিয়ে আসায় কলকাতার বাজারে তাই আনন্দের ঢেউ। আড়ত থেকে গলিপথ—সর্বত্র একই কথা, পূজায় আসছে বাংলাদেশি ইলিশ! ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও চলছে রুপালি উৎসবের খবর। কিন্তু এপারে ভিন্ন দৃশ্য। পায়রা নদীতীরের মাঝবয়সী জেলে শফিক গাজী বললেন, ‘আমরা নদীতে মাছ পাই না। বাচ্চারা মাছের ঝোল চায়, কিন্তু ঘরে ইলিশ আনা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা ইলিশ ধরছি ঠিকই, কিন্তু খেতে পারছি না। আমাদের অভিমান কি কারো কানে পৌঁছে?’
জমজমাট আলীপুরের ইলিশ মোকাম : পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আলীপুর মৎস্যবন্দরে ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রতিদিন ভিড় করে কয়েক শ ট্রলার। সাধারণ সময়ে প্রতিদিন ওঠে ৫০ থেকে ১০০ টন মাছ। ইলিশ মৌসুমে সেই বাজার হয়ে ওঠে জমজমাট। আলীপুরের আড়তদার সেলিম মিয়া বললেন, ‘আমাদের এখানে ওঠা মাছ যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, আবার রপ্তানি হয় মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুরেও।’ বন্দরের শ্রমিক রফিক মৃধার সঙ্গে দেখা হলো আড়ত ঘাটে। কাঁধে ভেজা জালের গন্ধ নিয়ে বললেন, ‘দিনে দেড় হাজার টাকা রোজগার হয়। তবে ঝড় হলে কাজও নাই, খাওয়াও নাই। এই পেশা একেবারে জুয়া—কখনো মাছভরা ট্রলার, কখনো খালি হাতে ফেরা।’ পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমান বলেন, ‘রপ্তানি বৈদেশিক মুদ্রা আনে, উষ্ণ হয় দুই বাংলার সম্পর্কও। কারণ ইলিশ শুধু মাছই নয়, দুই বাংলার আবেগের প্রতীক। কিন্তু যখন দেশের বাজারেই অভাব, তখন বাইরের চাহিদা মেটানো কতটা সুবিচার?
রুপসীবাংলা৭১/এআর

