গৌতম কুমার এদবর
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
বাঙালির সনাতন সমাজজীবনে শারদীয় দুর্গোৎসবের বিদায়ের রেশ কাটতে না কাটতেই পূর্ণিমা তিথিতে উদ্ভাসিত হয় কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা। শস্যশ্যামলা বাংলার ঘরে ঘরে ঐশ্বর্য, শান্তি ও সমৃদ্ধির দেবীকে বরণ করে নেওয়ার এই উৎসব একসময় গ্রামীণ জনপদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মিলনের অন্যতম বড় মাধ্যম ছিল। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় আলোকিত আঙিনা, ধানের শীষ ও আলপনার সুষ্মায় মুখরিত থাকত প্রতিটি জনপদ। লক্ষ্মীপূজার পূর্ণিমা রাত হয় বছরের সবচেয়ে উজ্জ্বল রাত।
১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার সেই রাত পূর্ব বাংলার সনাতনীদের জন্য আশীর্বাদের পরিবর্তে নেমে এসেছিল ঘোর অমাবস্যা ও এক কলঙ্কজনক ইতিহাস হয়ে। লক্ষ্মী পূজার রাতে পূর্ববাংলার নোয়াখালীতে সনাতনীদের বাড়িতে প্রদীপের বদলে জ্বলেছিল আগুনের লেলিহান শিখা, অস্ত্রের আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল অনেক হিন্দু, আর মা-বোনের আত্মচিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। যারা প্রতিরোধ গড়তে গিয়ে1ছিলেন, তাদের অনেকেই নিহত হন এবং কিছু শ্রেণি জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত হয়ে জীবন বাঁচায় মাত্র। লক্ষ লক্ষ সনাতনী দেশান্তরী হয়েছিল।
১৯৪৬ সাল—ব্রিটিশ ভারতের অন্তিম লগ্নে রাজনৈতিক স্বার্থান্ধতা এবং ধর্মীয় মেরুকরণের বিষবাষ্প এই শাশ্বত বাংলার আকাশকে চিরতরে ম্লান করে দেয়। ১৯৪৬ সালের নোয়াখালী দাঙ্গা এবং ১৯৪৭ সালের দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সংঘটিত দেশভাগ কেবল ভৌগোলিক সীমানাই বদলায়নি, বরং পূর্ব বাংলার হিন্দু সমাজের আত্মিক ও সামাজিক ভিত্তিমূলে চরম আঘাত হেনেছিল। কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার আলো সেদিন পূজার প্রদীপের শিখায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা পরিণত হয়েছিল লেলিহান আগুনে। প্রদীপের আলোর পরিবর্তে হিন্দু বাড়ি-ঘর ও দোকানপাট পোড়ার শিখায় আলোকিত হয়েছিল নোয়াখালী তথা পূর্ব বাংলার আকাশ-বাতাস। ভারতীয় ইতিহাসে এটি এক নারকীয় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার রূপ নিয়েছিল। হিন্দুরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই গুজব যেন সব শেষ করে দিয়েছিল। ভারতীয় ইতিহাসে এমন নক্কারজনক হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা আর কখনোই হয়নি, যা ‘চল্লিশের রায়ট’ নামেও খ্যাত। সেই রায়ট নোয়াখালী থেকে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ে সারা পূর্ব বাংলায়, এমনকি তা কলকাতায়ও দাঙ্গার রূপ নিয়েছিল।
১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে যখন সমগ্র বাঙালি হিন্দু সমাজ শারদীয় আনন্দ শেষে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলার বিভিন্ন এলাকায় (বর্তমান লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চল) সুপরিকল্পিত ও নারকীয় সাম্প্রদায়িক আক্রমণের বিষবাষ্প দানা বেঁধেছিল। উৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই বিষাদে রূপ নেয়। লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ এবং নারীদের ওপর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে অকথ্য উন্মত্ত জনতা গ্রামের পর গ্রামে প্রবেশ করে বাড়িঘর, গোয়ালঘর এবং ধানের গোলাগুলোতে অগ্নিসংযোগ করে। অনেক পরিবারকে জীবন্ত পুড়িয়ে বা ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে হত্যা করা হয়। পুরুষদের জোর করে টুপি পরা, দাড়ি রাখা এবং নারীদের সিঁদুর মুছে ফেলা ও শাঁখা ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটে। বাড়ির পুরুষদের সামনে নারীদের ধর্ষণ করাসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই যা করা হয়নি। নির্যাতনের শিকার হন সাধারণ মানুষ। লক্ষ্মী পূজার রাতে গৃহস্থের আঙিনায় যে লক্ষ্মীর পদচিহ্ন আকার কথা ছিল, সে রাতে সেখানে নেমে আসে বিভীষিকা ও মৃত্যুর মিছিল।
১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে কলকাতার ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ এবং পরবর্তী সময়ে সংঘটিত ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর রক্তক্ষয়ী সংঘাত পুরো বাংলায় এক চরম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করেছিল। কলকাতার সেই দাঙ্গার খবর, অপপ্রচার এবং প্রতিহিংসার আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব বাংলার জেলাগুলোতে। বিশেষ করে নোয়াখালী ও ত্রিপুরা অঞ্চলে তখন মুসলিম লীগের রাজনৈতিক প্রভাব এবং পাকিস্তান দাবির পক্ষে তীব্র প্রচারণা চলছিল।
নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ ও তৎকালীন ত্রিপুরা (বর্তমান চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর অংশ) জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় দাঙ্গার প্রধান সূত্রপাত ঘটে। তৎকালীন স্থানীয় প্রভাবশালী হিন্দু জমিদার রাজগঞ্জের জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর পরিবারের সাথে স্থানীয় কৃষক নেতা গোলাম সারওয়ার হুসাইনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়।
১৯৪৬ সালের দাঙ্গার সূচনা ও বিস্তারে গোলাম সারওয়ার হুসাইন নামক একজন স্থানীয় নেতার ভূমিকা ছিল। তিনি একসময় কৃষক প্রজা পার্টির রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে নোয়াখালীতে মুসলিম লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। তাঁর এবং তাঁর অনুসারীদের উদ্যোগে বিশাল সশস্ত্র জনতা বা উন্মত্ত ভিড় একত্রিত করে নোয়াখালী দাঙ্গা সংগঠিত করা হয়েছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
গুজবের ভূমিকা: যেভাবে রিউমার ছড়িয়েছিল
১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে (কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার ঠিক প্রাক্কালে) রামগঞ্জের প্রভাবশালী জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর বাড়িতে ভারত সেবাশ্রম সংঘ থেকে আসা একজন সন্ন্যাসী বা সাধু অবস্থান করছিলেন। সে সময় কলকাতার দাঙ্গার পর পুরো নোয়াখালী অঞ্চলে চরম আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে স্থানীয় পর্যায়ে একটি তীব্র গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, ওই জমিদার বাড়িতে আগত সন্ন্যাসী নাকি স্থানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক বা বলিদানের ষড়যন্ত্র করছেন। এই গুজব দ্রুত সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি করে।
স্থানীয় কৃষক নেতা এবং পীর পরিবারের সন্তান গোলাম সারওয়ার হুসাইনী এলাকার প্রভাবশালী হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে খাজনা মওকুফ এবং শোষণের প্রতিবাদে বিভিন্ন আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন। রামগঞ্জের জমিদারদের সাথে তাঁর এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিরোধ অনেক পুরনো ছিল। পুরনো সেই বিরোধে এবার ঘি ঢেলে দিল জমিদারবাড়িতে আগত ভারত সেবাশ্রমের সন্ন্যাসীকে ঘিরে প্রচারিত গুজব।
সন্ন্যাসী সম্পর্কে গুজব স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ার পর গোলাম সারওয়ার হুসাইন চৌকিদারের মাধ্যমে জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান বা কৈফিয়ত তলব করেন বলে জানা যায়। কিন্তু জমিদারের পক্ষ থেকে কোনো সন্তোষজনক জবাব বা সাড়া পাওয়া যায়নি। জমিদারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে গোলাম সারওয়ার হুসাইন শাহাপুর বাজারে তাঁর অনুসারী ও স্থানীয় মুসলমানদের নিয়ে একটি বিশাল জনসভা ও সমাবেশের ডাক দেন। অভিযোগ রয়েছে যে, ওই সমাবেশে জমিদার ও ওই সন্ন্যাসীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সমাবেশের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার রাতেই উন্মত্ত জনতা ও সশস্ত্র দল রামগঞ্জের জমিদার বাড়ি এবং আশপাশের হিন্দু পাড়াগুলোতে আক্রমণ চালায়। জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীর বাড়ি ঘেরাও করা হয় এবং এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমেই মূলত পুরো নোয়াখালী অঞ্চলে দাঙ্গা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
ভারত সেবাশ্রম সংঘের সন্ন্যাসীর উপস্থিতি এবং তাঁকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া গুজবটি ছিল সেই তাৎক্ষণিক ‘স্ফুলিঙ্গ’, যা গোলাম সারওয়ার হুসাইন ও স্থানীয় জমিদারদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের আগুনে ঘি ঢেলে নোয়াখালীর সেই ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক ট্র্যাজেডির জন্ম দিয়েছিল।
দাঙ্গাকারীদের প্রধান ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা রামগঞ্জের ওই জমিদার পরিবারের (জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরী ও তাঁর পরিবার) ওপর চরম বিপর্যয় নেমে আসে: ব্যাপক ভাঙচুর, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। জমিদার বাড়ির নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা টিকতে পারেনি। জমিদার পরিবারের সদস্য ও তাঁদের সাথে থাকা অনেকেই দাঙ্গাকারীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। বহু ঐতিহাসিক বিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে যে, জমিদার রাজেন্দ্রলাল চৌধুরীসহ পরিবারের অনেক সদস্য এই হামলায় প্রাণ হারান এবং বাড়িটিকে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করা হয়।
নোয়াখালীর রামগঞ্জ থানার বিভিন্ন বাজার ও হিন্দু অধ্যুষিত পাড়ায় হঠাৎ করে সংঘবদ্ধ আক্রমণ শুরু হয়। প্রথম দিকে বাজারগুলোতে লুটপাট এবং পরবর্তীতে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। উন্মত্ত জনতা স্লোগান দিতে দিতে গ্রামের পর গ্রামে চড়াও হয়। এই আক্রমণের শুরুতেই স্থানীয় কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিকে হত্যা করা হয় এবং ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে পুরো এলাকাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে ফেলা হয়। সাধারণ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এই আকস্মিক ও ব্যাপক আক্রমণের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। পুলিশ প্রশাসন তখন প্রায় নিষ্ক্রিয় ছিল অথবা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
রামগঞ্জ ও সোনাপুর থেকে শুরু হওয়া এই প্রাথমিক সংঘর্ষ মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মতো নোয়াখালীর চাটখিল, সেনবাগ, বেগমগঞ্জ এবং ত্রিপুরার হাজীগঞ্জ ও মতলব এলাকার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ কিছু স্থানীয় বিরোধ বা রাজনৈতিক উসকানিতে তৈরি হওয়া এই বিশৃঙ্খলা দ্রুত নিয়ন্ত্রণহীন এক নারকীয় তাণ্ডবে রূপ নেয়—যা লক্ষ্মী পূজা ও শারদীয় আনন্দের দিনগুলোকে চিরতরে রক্তের দাগে ঢেকে দেয়।
দাঙ্গার স্বরূপ ও নৃশংসতা
হত্যা ও শারীরিক নির্যাতন: দাঙ্গার প্রাথমিক পর্যায়েই পরিকল্পিতভাবে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়। অনেক স্থানে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
নারীদের ওপর নির্যাতন: এই দাঙ্গার সবচেয়ে কলঙ্কজনক দিক ছিল নারীদের ওপর চালানো নির্যাতন। বহু নারীকে প্রকাশ্যে অপমান, শারীরিক নির্যাতন ও অপহরণের শিকার হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষদের চোখের সামনে নারীদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালানো হয়, যা সমাজে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ট্রমা তৈরি করেছিল।
জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ: নোয়াখালী দাঙ্গার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সরাসরি হত্যা বা উচ্ছেদের পাশাপাশি ব্যাপকহারে বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করার কৌশল। আক্রমণকারীদের একটি বড় অংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার শর্তে জোরপূর্বক কালেমা পড়িয়ে এবং মুসলিম নামে ভূষিত করে ধর্মান্তরিত করে। অনেক ক্ষেত্রে বলপূর্বক ধর্মান্তরকরণের পক্ষে লিখিত স্ট্যাম্প বা কাগজপত্রে সই নেওয়া হতো এবং তাদের মাথায় টুপি পরাতে বা ইসলামি রীতি মেনে চলতে বাধ্য করা হতো। বহু পরিবার প্রাণ বাঁচাতে ও সম্ভ্রম রক্ষায় সেসময় সাময়িকভাবে এই চরম হুমকিমূলক পরিস্থিতির শিকার হতে বাধ্য হয়েছিল।
ধর্মীয় উপাসনালয় ধ্বংস ও লুণ্ঠন: বহু প্রাচীন মন্দির ধ্বংস করা হয়, প্রতিমা ভাঙচুর করা হয় এবং সনাতন ধর্মের ধর্মীয় প্রতীক ও চিহ্নগুলো জোরপূর্বক মুছে ফেলা বা বিনষ্ট করা হয়। নোয়াখালীর রামগঞ্জ, চাটখিল, সেনবাগ ও বেগমগঞ্জ এলাকার শত শত গ্রাম রাতারাতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা বা শারদীয় উৎসবের প্রদীপের আগুনের পরিবর্তে সেদিন জ্বলে উঠেছিল শত শত মানুষের বসতবাড়ির লেলিহান শিখা।
সর্বস্বান্ত লুণ্ঠন: ঘরবাড়ির সোনাদানা, টাকা-পয়সা, বাসনপত্র, গবাদিপশু এবং ফসলের ভাণ্ডার সম্পূর্ণ লুট করে নেওয়া হয়। যাদের সামান্য যা কিছু সম্বল ছিল, তা কেড়ে নিয়ে তাদের একেবারে শূন্যহাতে পথে নামিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে মানুষগুলোর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড চিরতরে ভেঙে যায়।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, সেই দাঙ্গায় হাজার হাজার হিন্দুকে হত্যা এবং হাজার হাজার মানুষকে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল। প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়শিবিরে প্রায় ৫০,০০০ থেকে ১ লক্ষের বেশি মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ত্রাণের তাঁবুতে গিয়েছেন এবং পরবর্তী সময়ে স্থায়ীভাবে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও অন্যান্য নিরাপদ অঞ্চলে চলে গিয়েছিলেন।
১৯৪৬ সালের নোয়াখালীর সেই দিনগুলোতে যে ক্ষয়ক্ষতি এবং নির্যাতন সাধিত হয়েছিল, তা কেবল কিছু কাঠামোগত ধ্বংস বা শারীরিক আঘাত ছিল না; এটি ছিল একটি জনপদের সামাজিক সম্প্রীতি, মানবতা এবং আত্মবিশ্বাসের ওপর চরম আঘাত। এই নির্মম ঘটনাগুলোই পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রেক্ষাপটকে আরও তীব্র ও স্থায়ী রূপ দিয়েছিল।
গোলাম সারওয়ার হুসাইন: রাজনৈতিক পটভূমি ও পরিচয়
শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক যখন বাংলার কৃষক-প্রজাদের অধিকার রক্ষায় ও মহাজনদের শোষণ থেকে তাদের মুক্ত করতে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ গঠন করেন, তখন পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের মতো নোয়াখালীর স্থানীয় পর্যায়ে গোলাম সারওয়ার হুসাইন এই রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হন।
ফজলুল হকের অনুসারী হিসেবে গোলাম সারওয়ার সেই সময়ে সাধারণ মুসলমান কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তিনি জমিদার ও মহাজনদের চড়া সুদের বিরুদ্ধে এবং কৃষকদের পক্ষে নানা আন্দোলন পরিচালনা করতেন। সেই সুবাদেই তিনি নোয়াখালীর রাজনীতিতে একজন প্রভাবশালী নেতা হয়ে ওঠেন।
১৯৪৬ সালের দাঙ্গার ঠিক আগে বা সেই সময়টাতে গোলাম সারওয়ার হুসাইন মূলধারার কৃষক প্রজা পার্টির আদর্শ বা ফজলুল হকের অবস্থান থেকে সরে এসে তৎকালীন পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়েন কিংবা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে যান—যা নোয়াখালীর ওই ট্র্যাজেডিতে একটি বড় ভূমিকা রেখেছিল।
১৯৪৬ সালের নোয়াখালী দাঙ্গার অন্যতম আলোচিত চরিত্র সৈয়দ শাহ গোলাম সারোয়ার হুসেইনী-এর পারিবারিক ও বংশগত পরিচয় এবং পটভূমি বেশ সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী ছিল। ঐতিহাসিক দলিল ও তথ্যানুযায়ী তাঁর পরিবার সম্পর্কে জানা যায়:
বংশ পরিচয় ও আদি নিবাস: গোলাম সারওয়ার হুসেইনীর পূর্বপুরুষরা মূলত উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ইরাক বা মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চল থেকে ভারতের দিকে এসেছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তাঁদের পরিবারের পূর্বপুরুষ (যেমন—সৈয়দ শাহ জকি উদ্দিন হুসাইনী) ১৮১৫ বা ১৮১৬ সালের দিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পটিয়া হয়ে নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ থানার শ্যামপুর এলাকায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন। পরিবারটি নোয়াখালীর রামগঞ্জের শ্যামপুর দায়রা শরিফ-এর বংশগত পীর বা আধ্যাত্মিক সেবক হিসেবে স্থানীয় অঞ্চলে অত্যন্ত পরিচিত ও প্রভাবশালী ছিল। এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে এই পরিবারটির একটি বিশেষ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা ছিল।
পারিবারিক ঐতিহ্য: গোলাম সারওয়ারের বাবা এবং দাদা উভয়েই সুফি পীর ও সাধক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁরা কঠোরভাবে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতেন এবং স্থানীয় জনপদে তাঁদের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আধ্যাত্মিক ভিত্তি ছিল। পীর পরিবারের সন্তান হওয়ার সুবাদে গোলাম সারওয়ার শৈশব থেকেই স্থানীয় সমাজে অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সাধারণ মানুষের ওপর তাঁর পরিবারের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব বেশ সুদৃঢ় ছিল।
পারিবারিক ঐতিহ্য ও ধর্মীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই গোলাম সারওয়ার পরবর্তী সময়ে নোয়াখালীর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি শ্যামপুর দায়রা শরিফের উত্তরাধিকার ও পীর পরিচয়ের পাশাপাশি কৃষক রাজনীতি, আইন পেশা এবং পরবর্তীতে তৎকালীন প্রাদেশিক আইনসভার রাজনীতিতে যুক্ত হন।
গোলাম সারওয়ার হুসাইন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে অবিভক্ত বাংলার জনপ্রিয় নেতা এবং কৃষক প্রজা পার্টির প্রধান এ কে ফজলুল হক (শেরেবাংলা)-র অত্যন্ত অনুসারী ও ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন।
পূর্ব বাংলার ইতিহাসে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার পটভূমিতে ঘটে যাওয়া ১৯৪৬ সালের রায়ট এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগ কেবল কিছু তারিখ বা পরিসংখ্যান নয়; এটি লাখো মানুষের কান্না, বেদনা এবং শেকড় হারানোর এক জীবন্ত দলিল। যে মাটিতে তাদের পূর্বপুরুষের রক্ত ও ঘাম মিশে ছিল, সেখান থেকে আকস্মিক বিতাড়িত হওয়ার এই ট্র্যাজেডি মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় লজ্জা। ইতিহাসের এই কালো অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ধর্মান্ধতা, অসহিহনূতা এবং ঘৃণার রাজনীতি কতটা কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করতে পারে।


