নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
আজ ২০ জুন ২০২৬ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নারীমুক্তি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামালের ১১৫তম জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে বিকেল ৩:৩০ টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে সুফিয়া কামাল স্মারকবক্তৃতা, সুফিয়া কামাল সম্মাননা প্রদান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। মূল অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক উম্মে সালমা বেগম। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা এবং শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক খুরশীদা ইমাম।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে সুফিয়া কামালের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন আগত অতিথিবৃন্দ, সংগঠনের নেত্রীবৃন্দ, সম্পাদকমন্ডলী এবং কর্মকর্তাগণ। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সুফিয়া কামালের কর্মজীবনের উপর নির্মিত ‘একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণে জননী সাহসিকা কবি সুফিয়া কামাল’-বিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন কালে উক্ত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও পরিচালকÑশামীম আখতার। প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন শেষে সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ইফ্ফাত আরা দেওয়ান। সম্মিলিত সংগীত পরিবশেন করেন ছায়ানটের শিল্পীবৃন্দ। সংগীত পরিবেশন শেষে ‘নারীর প্রতি বিরাজমান ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সহিংসতা নিরসনে সুফিয়া কামালের আলোয় পথচলা’ বিষয়ে স্মারকবক্তা হিসেবে- বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা। স্মারকবক্তৃতা শেষে সুফিয়া কামাল সম্মাননা প্রাপ্ত ব্যক্তির পরিচিতি পাঠ করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম। সম্মাননা প্রাপ্ত ব্যক্তির পরিচিতি পাঠ শেষে বরেণ্য চিত্রশিল্পী মু: আবুল হাশেম খান কে সুফিয়া কামাল সম্মাননা প্রদান করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা বর্ণনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও পরিচালকÑশামীম আখতার বলেন, প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণকালে সুফিযা কামালের বিষয়ে আমরা যা দেখেছি ও জেনেছি, তা নূতন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। খালাম্মার জীবন ও চিন্তাধারাকে ধারণ করার প্রয়াসে নির্মিত চলচ্চিত্রে কিছু দুর্লভ মুহূর্তও তুলে ধরা হয়। তাঁকে সত্যিকার অর্থে জানতে হলে তাঁর নিজের বক্তব্য এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষের স্মৃতিচারণ শোনা প্রয়োজন।
স্মারকবক্তৃতায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন,সুফিয়া কামালকে শুধু কবি, সমাজসংস্কারক বা নারী আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে দেখলে তাঁর প্রকৃত অবদান সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রূপান্তরমূলক নারীবাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ ও পথপ্রদর্শক। এই প্রবন্ধে সুফিয়া কামালের চিন্তা ও কর্মকান্ডকে পুণর্বিবেচনা করা হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে যে, তাঁর উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক ভাষ্যে নয়; বরং নারীকে জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি, জনপরিসর ও নাগরিকত্বের সমঅধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণে নিহিত ছিলো। এই আলোচনায় তাঁর আত্মজীবনী, সাহিত্যকর্ম, বেগম পত্রিকায় সম্পাদকীয় ভূমিকা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের দলিল এবং সমসাময়িক নারীর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ন্যান্সি ফ্রেজারের স্বীকৃতির রাজনীতি, ক্যারল গিলিগান ও জোয়ান ট্রন্টোর যতেœর নৈতিকতা, সারা আহমেদের অভিযোগ ও আবেগের রাজনীতি, জুডিথ বাটলারের শোকযোগ্যতা, কিম্বার্লে ক্রেনশ’র আন্তঃসংযোগবাদ, নায়লা কবীরের ক্ষমতায়ন তত্ত্ব এবং কেট ম্যান ও রিটা সেগাতোর নারীবিদ্বেষ ও যৌন সহিংসতার বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়েছে। সুফিয়া কামালের মূল লক্ষ্য ছিল নারীকে করুণা বা নির্ভরতার বিষয় হিসেবে নয়, বরং মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ ও পূর্ণ নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর নারীবাদ ছিল বাস্তব জীবনভিত্তিক, যেখানে শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবার ও জনপরিসরে নারীর অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। “বেগম” পত্রিকার মাধ্যমে তিনি নারীদের নিজেদের কথা বলার, লেখার ও মত প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন। তাঁর চিন্তায় নারীর ক্ষমতায়ন মানে ছিল নিজস্ব কণ্ঠ, চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার অর্জন। তিনি ধর্ম ও সংস্কৃতির বিরোধিতা না করে তার ভেতর থেকেই নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। বর্তমান সমাজে নারী বিদ্বেষ, সহিংসতা, ভিকটিম ব্লেমিং ও বৈষম্য প্রমাণ করে যে নারীর পূর্ণ নাগরিকত্বের প্রশ্ন এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সুফিয়া কামাল ন্যায়, সমতা, মানবিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা।
সুফিয়া কামাল সম্মাননা প্রাপ্ত ব্যক্তির বক্তব্যে বরেণ্য চিত্রশিল্পী মু: আবুল হাশেম খান বলেন, কবি সুফিয়া কামালের জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও মানুষের ভালোবাসা অর্জনের পেছনে ছিল তাঁর অসাধারণ মানবিকতা। তাঁর স্নেহের পরশ ও সাহসী প্রেরণা আমাদের অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে। নারী অধিকার, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনে আমরা সেই শক্তিকেই ধারণ করে এগিয়ে চলেছি। আজকের অনুষ্ঠানে যে আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে, তা আমাদের বর্তমান সমাজবাস্তবতা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। বিশেষ করে নারী অধিকার, নারীর নিরাপত্তা এবং সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে যে প্রশ্নগুলো আজও প্রাসঙ্গিক, সেগুলো আমাদের সামনে নতুন করে উঠে এসেছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, অধিকার অর্জনের সংগ্রাম কখনো থেমে থাকে না। মানবিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের প্রতি তাঁর জীবন একটি বড় শিক্ষা। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সাহস, অধ্যবসায়, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে একজন মানুষ সমাজ পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হতে পারেন।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, কবি সুফিয়া কামালকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হলে তাঁকে নিয়ে আরও গভীর গবেষণা ও পুনঃপাঠ প্রয়োজন। নারীর মর্যাদা, রাজনৈতিক অধিকার, সমতা ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সুফিয়া কামালের অবদান নতুনভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। বর্তমান সময়ে নারীর বিরুদ্ধে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সহিংসতাকে তিনি একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন শুধু নারীদের নয়, সমগ্র সমাজের দায়িত্ব এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। পাশাপাশি সকলে মিলে অর্ন্তভ’ক্তিমূলক নারী আন্দোলন গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু কবি সুফিয়া কামালের ১১৫ তম জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ করে বলেন, আজ ২০ জুন। এই দিনে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে কবি সুফিয়া কামালকে স্মারণ করি এবং তার এই বর্ণাঢ্য জীবনের উদযাপন করি। মাত্র ৩৫ মিনিটের একটি প্রামাণ্যচিত্রে সুফিয়া কামালের মতো একজন বিশাল ব্যক্তিত্বের জীবনকে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরা প্রায় অসম্ভব- যা নির্মাতা নিজেই স্বীকার করেছেন। তবে এই প্রামাণ্যচিত্র সুফিয়া কামালের বর্ণাঢ্য জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বরিশালের একটি শিক্ষানুরাগী কিন্তু রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেয়া সুফিয়া কামাল সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় একজন সাধারণ নারী কীভাবে অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর জীবন সেই প্রশ্নের এক উজ্জ্বল উত্তর। প্রায় এক শতাব্দীব্যাপী তাঁর জীবনযাত্রায় আমরা দেখি একজন নারী কীভাবে মানবকল্যাণ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, নারী অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছেন। স্বল্পশিক্ষিত এক কিশোরী বধূ থেকে আত্মপ্রত্যয়ী, দৃঢ়চেতা, নির্ভীক এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হওয়ার গল্প আমাদের জন্য এক অসাধারণ অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর কর্মকান্ডের মূল ভিত্তি ছিল মানবকল্যাণ, মানবমুক্তি এবং ন্যায়বিচারের চেতনা। তিনি শুধু নিজে পথ চলেননি; অসংখ্য নারী-পুরুষকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়েছেন। আজকের দিনে আমরা শুধু তাঁকে স্মরণ করছি না, তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণেরও অঙ্গীকার করছি। কীভাবে একজন মানুষ সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন এবং সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে পারেন- এইসকল বিষয় নতুন প্রজন্মের জানা প্রয়োজন। সুফিয়া কামালের জীবন আমাদের সেই শিক্ষা দেয়।
উক্ত অনুষ্ঠানে নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট প্রতিনিধিবৃন্দ, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির প্রতিনিধিবৃন্দ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঢাকা মহানগর কমিটির নেত্রীবৃন্দ, সম্পাদকমন্ডলী এবং ঢাকা, বেলাবো ও নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী জেলার কর্মী- সংগঠকবৃন্দ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ সহ প্রায় ৫০০ জন উপস্থিত ছিলেন।
আন্তরিক ধন্যবাদসহ


