নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
আজ ১৮ জুন ২০২৬, বিকাল ৩.৩০ মিনিটে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটিতে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতার লক্ষ্যে জেন্ডার বাজেট ২০২৬-২৭: বিশ্লেষণ ও প্রত্যাশা বিষয়ক সংবাদ-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ-সম্মেলনে মডারেটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শরমিন্দ নিলোর্মী। সম্মানিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট কতটা জেন্ডার সংবেদনশীল এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ও ক্ষমতায়নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তা মূল্যায়ন করা জরুরি। নারীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা, বৈষম্য নিরসন এবং ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জেন্ডার বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আন্তঃমন্ত্রণালয়গত সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাংবিধানিক অঙ্গীকার, এসডিজি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি এসময় আরো বলেন বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও তা যেন কেবল পরিসংখ্যানগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পরিবর্তন নিয়ে আসতে সক্ষম হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে নারী ও অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য দেওয়া সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ গ্রহণের উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
মূল বক্তব্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শরমিন্দ নিলোর্মী বলেন,
গত তিন অর্থবছর ধরে অর্থ বিভাগ জেন্ডার ফাইন্যান্সিয়াল ট্র্যাকিং মডেল ব্যবহার করে জেন্ডার বাজেটকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জেন্ডার বাজেটে নারীর ক্ষমতায়ন, নারী-পুরুষ সমতা এবং সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন বিষয়ে নতুন কিছু বিশ্লেষণ যুক্ত হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডে নারীকে পরিবারপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি, স্নাতকোত্তর পর্যন্ত ছাত্রীদের অবৈতনিক শিক্ষা, ইউনিয়ন পর্যায়ে নারী কল্যাণ কেন্দ্র স্থাপন এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক ও দক্ষতা উন্নয়ন সহায়তা উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সমান মজুরি ও নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি থাকলেও সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় না। জেন্ডার বাজেট প্রণয়নের পাঁচটি ধাপের মধ্যে প্রভাব মূল্যায়ন বা অভিঘাত পর্যালোচনার অংশটি এখনও দুর্বল রয়ে গেছে। নারী-পুরুষ সমতা বিষয়ক বিভিন্ন সূচক উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবায়ন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের বিশ্লেষণ অনুপস্থিত। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেন্ডার-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ মোট বাজেটের ৩৪.৮ শতাংশ এবং জিডিপির ৪.৮ শতাংশ, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সরকারি সেবায় নারীর প্রবেশাধিকার এই চারটি বিষয়ের ওপর বাজেটটি বিন্যস্ত হলেও নারীর নিরাপত্তা, সাইবার সহিংসতা প্রতিরোধ, দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শোভন কাজের ক্ষেত্রে বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছে। একই সঙ্গে দিবাযতœ কেন্দ্র ও নারী কৃষক কার্ডের মতো ঘোষিত উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন ও বাজেট বরাদ্দের বিষয়টি স্পষ্ট নয়, যা আরও পর্যালোচনার দাবি রাখে। তিনি এসময় জেন্ডার বাজেট বাস্তবায়নে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেন । সুপারিশসমূহ হলো: বিভাজিত তথ্যের সংশ্øেষ(যেমন: এনবিআর-টিন); ব্যয় দক্ষতা বৃদ্ধি; প্রতিটা থিম/সাব থিম এর নিরুপণযোগ্য সূচক কেপিআই হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে; ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ এর পূর্ণাঙ্গ ম্যাপিং ও মোকাবেলা করার কৌশল নিরুপণ করতে হবে; সরকার ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করতে হবে; বাস্তবায়ন পর্যালোচনা উপস্থাপনে নারীর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রকল্প দিয়ে কাজ শুরু করা যেতে পারে।
সম্মানিত আলোচকের বক্তব্যে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, জেন্ডার বাজেট এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় বলেন জেন্ডার বাজেটের সঠিক বাস্তবায়নের জন্য তথ্য-উপাত্তের নির্ভুলতা এবং স্বচ্ছ মূল্যায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন মানসম্মত শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র স্থাপন, নারীদের কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তাদের জন্য তথ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি আরো বলেন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে কেবল ভাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সাথে যুক্ত করার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। এছাড়া নারীর জন্য কল্যাণমূলক প্রকল্পের গুণগত মান বজায় রাখাসহ নিয়মিত প্রকল্পের অগ্রগতি পরিবীক্ষণ এবং সঠিক সময়ে বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করার মাধ্যমে নারীর প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন। সর্বোপরি নারীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে একটি দীর্ঘমেয়াদী কর্ম কৌশলের ওপর জোর দেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মডারেটর হিসেবে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন,নারীর ক্ষমতায়ন এবং সমতাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই জেন্ডার বাজেট। জেন্ডার বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নারীর সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি ব্যাপক্। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা কিভাবে নিশ্চিত করছি সেটা বিবেচনার বিষয়। সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি সম্পদে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাইবার সিকিউরিটির ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। অর্থ মন্ত্রনালয়ের গৃহীত পদক্ষেপ কতটুকু ফলপ্রসু সেটা দেখার বিষয়। জেন্ডার বাজেটের মনিটরিং, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন যথাযথভাবে করার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি এসময়।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেত্রীবৃন্দ, সম্পাদকমন্ডলী, এবং কর্মকর্তাবৃন্দ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি।


