ব্রেকিং নিউজ ১: প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানে বারবার ত্রুটি, কারণ জানতে চায় সংসদীয় কমিটি   |   ব্রেকিং নিউজ ২: আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জিতে নামিবিয়ার ইতিহাস   |   ব্রেকিং নিউজ ৩: শিক্ষক নিয়োগে ১৮ রায় জালিয়াতি : তদন্ত কমিটি গঠন করলেন আপিল বিভাগ

১২ মার্চ যাদু মিয়ার ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকীমশিউর রহমান যাদু মিয়া রাজনীতির ‘ধ্রুব মশাল’

RelatedPosts

নিজস্ব প্রতিনিধি //

।। এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া।।
জন্মালে মরতে হবে এটাই স্বাভাবিক এবং চিরসত্য। তবে এই মরণের মাঝে কিছু মরণ থাই পাহাড়ের চেয়ে ভারী বোধ হয়। জাতীয় নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়ার মৃত্যু সে কথাটি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে অনেককেই। মানুষ মাত্রই দোষে এবং গুণে সমৃদ্ধ। কোন মানুষই বিতর্কের উর্দ্ধে থাকতে পারে না, থাকেও না। যাদু মিয়ার সম্পর্কেও বিতর্ক দীর্ঘসময়ের।

আমাদের রাষ্ট্রে এবং সমাজে রাজনৈতিক প্রশ্নের জটসমূহ যখন জটিল থেকে জটিল আকার ধারন করতে থাকে, যাদু মিয়া সম্পর্কিত বিতর্কও নতুন নতুন মাত্রা অর্জন করতে থাকে। রাজনীতিতে একটি অংশ তাঁকে একেবারে খারিজ করতে পারলে বেঁচে যান মনে হয়। আর অন্য অংশটি খুব বেশী স্মরণের প্রয়োজনও বোধ করে না, এই জন্য যে তাকে স্মরণ করলে কৃত্রিমভাবে তৈরী অনেক মহানায়ককে পিছনের টেবিলে বসাতে হয। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যে দলটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, নিজের দলের প্রতীক তুলে দিয়েছেন তাদের হয়তো মনেই নেই বা তারাও মনে করতে চায় না মশিউর রহমান যাদু মিয়া নামে কেউ জড়িত ছিলেন তাদের জন্মের বেদনার সাথে।

জীবন ও প্রাপ্তির পূর্ণতার মধ্যে দ্বন্ধ থাকে চিরকালই। তবে প্রত্যেকের ক্ষেত্রে তা একই ভাবে দেখা যায় না। কারও কারও জীবনে প্রাপ্তি ও পূর্ণতার একসাথে সমন্বয় হয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসাবে দেখা দেয়। যার জীবনে সেটা দেখা দেয় সাধারণ মানুষ সে জীবনকে ভালবাসে, শ্রদ্ধা করে এবং স্মরণ করে। আমাদের কালে এমনই একজন মানুষ হচ্ছেন জাতীয় নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া।

যাদু মিয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ১৯৭৯সালের ১২মার্চ, পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ৪৬ বছর। কিন্তু যে জীবনকে রেখে গেছেন অসংখ্য অনুসারী, অনুরাগী ও গুনমুগ্ধকরদের মাঝে-সে জীবনের মৃত্যু নাই। সে জীবন বেঁচে থাকে কালের যাত্রা পথে, মানুষের জীবন চলার পথের আলোক বর্তিকা হিসাবে। জীবনের যে পরিচয় যাদু মিয়া রেখে গেছেন তার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। পঞ্জিকার হিসাবে তা সারে চার দশক পার হয়ে গেছে। নশ্বর মানুষের জন্য এ এক পরিপূর্ন জীবনই বটে-যদিও কখনো কখনো তা ঈর্ষনীয়।

১৯২৪ সালের ৯ জুলাই নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছাত্রজীবনেই গণমানুষের কল্যাণে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি বার্মা গিয়ে যুদ্ধাহতদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। তেতাল্লিশ মহাদুর্ভিক্ষের সময় রংপুরের চরাঞ্চলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। এর স্বীকৃতিস্বরূপ তার নামানুসারে একটি চরের নাম হয় ‘যাদুর চর’। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার সময় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির লক্ষ্যে হত্যাযজ্ঞের বীভৎসতার ছবি তুলে বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করেছিলেন। ফলে ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেফতার করে। দিল্লিতে তার বিচার অনুষ্ঠিত হয়। তার যুক্তির কাছে সরকার পরাজিত হয়ে বিশেষ স্কোয়াড দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেয়। তার প্রচেষ্টায়ই সেই অঞ্চলে দাঙ্গা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে জেলা বোর্ডের কনিষ্ঠতম চেয়ারম্যান হিসেবে পরপর দু’বার নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের যুব উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। একই সালে মওলানা ভাসানীর আহ্বানে কাগমারী সম্মেলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ১৯৬২ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পার্লামেন্টে বিরোধী দলের উপনেতা ছিলেন। ১৯৬৩ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য গ্রেফতার হন। ষাটের দশকের শেষ দিকে ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক হন এবং আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার দাবি উপস্থাপন করেন। ভাসানীর আহ্বানে জাতীয় পরিষদের সদস্যপদ ত্যাগ করেন।

১৯৬৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের টোবাটেকসিংয়ে কৃষক সম্মেলনে ইয়াহিয়া খানকে গাদ্দার বলার কারণে তাকে গ্রেফতার করে সাত বছর সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পল্টন ময়দানে মওলানা ভাসানীর আহ্বানে অনুষ্ঠিত জনসভায় ন্যাপের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ এবং প্রতীকী পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৭৪ সালে গ্রেফতার ও ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে তিনি কারামুক্ত হন। ১৯৭৬ সালে ভাসানীর নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চের প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ভাসানীর মৃত্যুর পর ন্যাপের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। যারই ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন যাদু মিয়ার নাতি জেবেল রহমান গানি।

প্রতিটি সমাজ তার ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই জন্ম দেয় শ্রেষ্ট সন্তানদের। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের তেমনই এক শ্রেষ্ঠ সন্তান হচ্ছেন যাদু মিয়া। যে কোন ধরনের সমস্যা নিজের হাতে নিয়ে তা নিয়ন্ত্রনের জুড়িও ব্যতিক্রম। কোথায় কী বলতে হবে, কতটুকু বলতে হবে-সবই যেন ছিল তাঁর নিক্তিতে মাপা। সব কিছু মিলিয়েই যাদু মিয়া অপ্রতিদ্ধন্দী, অদ্বিতীয় ছিলেন। ব্যক্তি যাদু মিয়া এবং নেতা যাদু মিয়ার পার্থক্য খুঁজে পাওয়া বড়ই কষ্টের।

কথা বলতেন মেপে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলতেন না। আর যা বলতেন গুছিয়à