রুপসীবাংলা৭১ অর্থনীতি ডেস্ক : রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আর ঢালাওভাবে কর্মচারীদের উৎসাহ বোনাস দিতে পারবে না। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংকের বোনাস দেওয়ার ভিত্তি আর পরিচালন মুনাফা নয়, বরং হবে নিট মুনাফা। এ ছাড়া মুনাফা অর্জনের পর প্রথমে সরকারকে লভ্যাংশ দিতে হবে। সরকারকে লভ্যাংশ না দিলে, উৎসাহ বোনাসের যোগ্যতা অর্জন করলেও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কাছে তা দাবি করতে পারবে না।
এর আগে গত শনিবার (৬ সেপ্টম্বর)বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরও একই ধরনের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ব্যাংকের মূলধন ১০ শতাংশের নিচে হয় এবং প্রভিশন লস করে, তাহলে ডিভিডেন্ড ও বোনাস দিতে পারবে না। এ ছাড়া কোনো কর্মকর্তাকে বোনাস দেওয়া হবে না। যদি তারা প্রভিশন লস করেন। তিন মাসের ঋণ অনাদায়ি থাকলে তাকে ননপারফর্মিং লোন হিসেবে ধরা হবে।
তিনি বলেন, চেষ্টা করছি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার। গত কয়েক বছর অর্থ ব্যবস্থায় শঙ্কা তৈরি হয়, একটা অস্থিরতা বিরাজ করছিল সেখান থেকে ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ করছি এবং আংশিক হলেও কাজ করছি। ব্যালেন্স অব পেমেন্ট সবগুলোতেই উদ্বৃত্ত আছে এর কারণ হলো রেমিট্যান্সপ্রবাহ ২১% বেড়েছে আর সংকটের মধ্যে রপ্তানিও বেড়েছে।
তার এই বক্তব্যের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ইতোমধ্যেই এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকার খসড়া তৈরি করেছে। এতে ১৪টি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বোনাস প্রদানের শর্তাবলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খসড়া নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা থেকে ঋণ ও অগ্রিমের প্রভিশন, বিনিয়োগে মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধির প্রভিশন এবং অন্যান্য সম্পদ হ্রাস-বৃদ্ধির প্রভিশন বাদ দিয়ে নিট মুনাফা হিসাব করতে হবে। এই নির্দেশিকা ২০২৪ সালের উৎসাহ বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে। তবে নির্দেশিকার বাইরে অতিরিক্ত কোনো বোনাস দিতে হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অনুমোদন নিতে হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানান, এতদিন ব্যাংকগুলোতে উৎসাহ বোনাস প্রদানের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলার ঘাটতি ছিল। এবার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই অভিন্ন নির্দেশিকা তৈরি হচ্ছে। এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
সূত্র জানায়, অতীতে একটি নীতিমালা থাকলেও কয়েকটি বড় ব্যাংক তা মানেনি। যেমন— নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিনটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিধান থাকলেও সোনালী ব্যাংক ২০২৩ সালে পাঁচটি বোনাস দিয়েছে। এ কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গত ২৭ মার্চ সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) চিঠি দিয়ে অতিরিক্ত দুই বোনাসের অর্থ কর্মচারীদের কাছ থেকে ফেরত আনার নির্দেশ দেয়। তবে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কেউই সেই অর্থ ফেরত দেয়নি।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয় ব্যাংকের (সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল) বোনাস দেওয়া হবে পাঁচটি কর্মসম্পাদন সূচকের (পারফরম্যান্স মেট্রিকস) ভিত্তিতে। এগুলো হলো— চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হার; আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধির হার; ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ বৃদ্ধির হার; খেলাপি ঋণ আদায়ের হার; অবলোপন করা ঋণ আদায়ের হার।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব বা নম্বর থাকবে চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হারে (৫০-এর বেশি)। নম্বরের ভিত্তিতেই বোনাস নির্ধারণ করা হবে। যারা বেশি ভালো করবে, তারা সর্বোচ্চ তিনটি বোনাস পাবে। নম্বর কম হলে বোনাসের সংখ্যাও কমে যাবে। তবে যদি খুবই কম হয়, তাহলে কোনো বোনাস দেওয়া হবে না। প্রতিটি বোনাস মানে হলো কর্মচারীর এক মাসের মূল বেতনের সমান অর্থ।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের বাইরে আরও ছয়টি বিশেষায়িত ব্যাংক ও দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য কিছুটা ভিন্ন নিয়ম থাকছে।
বিশেষায়িত ছয় ব্যাংক : বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), কর্মসংস্থান ব্যাংক, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ও আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ক্ষেত্রে মোট চারটি সূচক বিবেচনা করা হবে। এখানে আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধির সূচকটি বাদ যাবে। তাদের সূচক হবে— চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হার; ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ বৃদ্ধির হার; খেলাপি ঋণ আদায়ের হার; অবলোপন করা ঋণ আদায়ের হার।
এ ছাড়া আইসিবির জন্য আলাদা সূচক হলো পুঁজিবাজারে লেনদেন বৃদ্ধির হার। এ ছাড়া নিট মুনাফা, বিনিয়োগের বিপরীতে লভ্যাংশ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্যও পৃথক নম্বর রাখা হবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের (বিএইচবিএফসি) ক্ষেত্রে আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধি ও অবলোপন করা ঋণ আদায়ের সূচকের পরিবর্তে নতুন সূচক রাখা হয়েছে—ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের বিপরীতে প্রকৃত আদায়ের হার। এ ছাড়া নিট মুনাফা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্যও আলাদা নম্বর থাকবে।
রুপসীবাংলা৭১/এআর

