গৌতম কুমার এদবরঃ সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি যুবক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারকে নিয়ে শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে তাঁদের ‘বিয়ে’ বা ‘হানিমুন’ এবং অল্প সময়ের বিচার ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত বিভিন্ন মুখরোচক ও বানোয়াট তথ্য প্রচার করা হয়েছিল, যার কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। অনুসন্ধানে ও পরিবারের বক্তব্যে উঠে আসা বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সৌদি আরবের মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম এবং সুইটি আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় নতুন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরনের মনগড়া তথ্য ছড়ানো হলেও, পরিবারের বক্তব্য এবং প্রকৃত ঘটনা ভিন্ন কথা বলছে।
বিয়ের ও হানিমুনের ভুয়া প্রচার বনাম পরিবারের দাবি:
ঘটনার পর থেকেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি চক্র দাবি করতে শুরু করে যে, নজরুল ও সুইটি স্বামী-স্ত্রী এবং তাঁরা সৌদিতে হানিমুনে গিয়ে বা বিবাহিত সূত্রে একসঙ্গে ছিলেন। তবে নিহত নজরুলের বাবা আব্দুল বাছির এই দাবি জোরালোভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, নজরুল তখনো বিয়েই করেননি এবং সুইটি আক্তার নামের কোনো মেয়েকে তাঁদের পরিবার চেনেই না। তাঁদের পরিবার এই বিয়ে বা সম্পর্ক সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কিছু জানত না। তবে তাঁদের ধারণা, তাঁরা দুজন হয়তো একই এলাকায় বা একই কর্মস্থলে কাজ করতেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হওয়া বিয়ে বা হানিমুনের গল্পগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
কারাবাস ও গ্রেপ্তার নিয়ে ধোঁয়াশা:
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর দেশ ছেড়ে সৌদিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী যুবক নজরুল ইসলাম। সৌদিতে যাওয়ার পর মাত্র ছয় মাস তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পান। এরপর প্রায় তিন বছর তিন মাস তাঁকে কারাগারে কাটাতে হয়। ঠিক কী কারণে বা কোন পরিস্থিতির শিকার হয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কিংবা তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি কী ছিল, সে বিষয়ে পরিবার আগে থেকে কিছুই জানতেন না।
আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ:
পরিবারের দাবি, সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের আইনি বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই এবং পরিবারকে কিছু না জানিয়ে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাত্র কিছুদিন আগেও নজরুলের সঙ্গে পরিবারের ফোনে কথা হয়েছিল, তখনো তিনি বড় কোনো বিপদের কথা জানাননি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষও তাঁদের সাথে কোনো যোগাযোগ করেনি বলে পরিবার জানায়।
দীর্ঘ কারাবাস ও আইনি সহায়তার অনুপস্থিতি:
প্রথম দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা কিছু সংবাদে মাত্র চার মাসের বিচারিক প্রক্রিয়ার কথা বলা হলেও, পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ তিন বছর তিন মাস কারাবন্দী রাখা হয়েছিল। সাধারণত বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে সংশ্লিষ্ট দেশের জেলখানা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিজ দেশের দূতাবাসকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করার কথা। কিন্তু দীর্ঘ এই কারাবাসের পুরো সময়জুড়ে নজরুলের পরিবার তো বটেই, এমনকি সৌদিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসও এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা নোটিশ পেয়েছিল কি না—তা নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানার পর সরকার বা সংশ্লিষ্ট এজেন্সির সাথে যোগাযোগের বিষয়েও পরিবার অন্ধকারে ছিল।
এই মর্মান্তিক সংবাদ পাওয়ার পর শোকে ভেঙে পড়ে পরিবার। ছেলের মৃত্যুর খবর সহ্য করতে না পেরে নজরুলের ফুফু আবেদা বেগম হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
ঋণের বোঝা ও মরদেহ ফেরানোর আকুতি:
ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রায় ৭ লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন বাবা আব্দুল বাছির। উপার্জনের একমাত্র অবলম্বনকে হারিয়ে এখন একদিকে যেমন ঋণের পাহাড়, অন্যদিকে চরম শোক—সব মিলিয়ে দিশেহারা পুরো পরিবার। পরিবারের পক্ষ থেকে এবং স্থানীয় সচেতন মহলের জোরালো দাবির মুখে, অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় খরচে নজরুল ইসলামের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের আন্তরিক হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টির সার্বিক খোঁজখবর নিচ্ছে।

