জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা মার্কিনের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদ ও প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্যবাদী চীন-রাশিয়ার পুঁজি ও শক্তির অনুপাতে বাজার পুনর্বন্টন নিয়ে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভূরাজনৈতিক ও রণনীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মালাক্কা প্রণালী সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরীয় দেশ বাংলাদেশকে স্ব স্ব পক্ষে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে সম্পৃক্ত করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সকল দেশপ্রেমিক শক্তি ঐক্য গড়ে তোলার আহবান জানান।
২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বিকাল ৪ টায় রাজধানীর তোফখানা রোডস্থ বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) ডাঃ এম. জাহাঙ্গীর হোসেনের সভাপতিত্বে এই সেমিনার অনুষ্টিত হয়। “বাংলাদেশকে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে স্ব স্ব পক্ষে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে মানবিক করিডোর, চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশীদেরকে ইজারা প্রদান এবং এনডিএ চুক্তিসহ সব দাসত্ব চুক্তি, সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ, সেনা উপস্থিতি ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচন ও করণীয়” শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম ও পাঠে সহযোগিতা করেন সহ-সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ দত্ত। সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তানজীমউদ্দিন খান, সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা, গবেষক ও লেখক মাহতাব উদ্দীন আহমেদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সহ-সভাপতি খলিলুর রহমান খান, শ্যামল কুমার ভৌমিক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সম্পাদক ও বাংলাদেশ ওএসকে গার্মেন্টস এন্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
বক্তারা বর্তমান বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে, রাষ্ট্রে যা কিছু ঘটছে তা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। এসবই পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় চলমান ঘটনাবলীর অংশ মাত্র। সুতরাং, বাংলাদেশে যা ঘটছে তা চলমান সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার ঘাত-প্রতিঘাতের অংশ। রাষ্ট্র বিমূর্ত কোনো সংগঠন নয়। বাংলাদেশ হলো একটি নয়াঔপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র। নয়া-ঔপনিবেশিক আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্রের চরিত্র হলো, সাম্রাজ্যবাদী লগ্নিপুঁজির নির্ভরযোগ্য বাজার, প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি ও সস্তা শ্রমশক্তি লুণ্ঠনের মৃগয়াক্ষেত্র হিসেবে সুরক্ষিত করা। সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের শিক্ষা দেওয়া নির্ভরযোগ্য দালাল সামন্ত, মুৎসুদ্দি শ্রেণি ও আমলাতন্ত্রের ওপর ভর করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে থাকে।
পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ^ব্যবস্থার ঘাত-প্রতিঘাত প্রতিনিয়তই পড়ছে বাংলাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে। চলমান তীব্র সংঘাতময় বিশ্বপরিস্থিতি দ্রুত দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বিশেষত ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগকারী মালাক্কা প্রণালী সংলগ্ন মিয়ানমার-বাংলাদেশসহ বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে কেন্দ্র করে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ভূ-রাজনীতিতে স্থানিক, আঞ্চলিক যুদ্ধ থেকে সামগ্রিক যুদ্ধের লক্ষ্যে একেকটি অঞ্চল একেকটি ফ্রন্টে পরিণত হয়ে উত্তপ্ত বারুদে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে। যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটে কতদূর বিস্তৃতি ঘটাবে সে নিয়ে বিশ্ববাসী উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দাবানলের মতো বিস্তৃতি লাভ করছে। ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরোক্ষ ন্যাটো-রুশ যুদ্ধের খোলস ছেড়ে যে কোনো মুহূর্তে প্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে রাশিয়া-ন্যাটো প্রত্যক্ষ যুদ্ধে। দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে তাইওয়ান প্রণালীতে ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বৃদ্ধি পাচ্ছে সামরিক উত্তেজনা। উভয়পক্ষ লাগাতারভাবে সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র সজ্জিত নৌ-মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে এবং সর্বাধুনিক সমরাস্ত্রে স্ব-স্ব অবস্থান গ্রহণ ও আশপাশের ঘাঁটিগুলোতে তা কেন্দ্রীভূত করছে। এ অঞ্চল চীনের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ভূ-রাজনীতিতে চীনের আধিপত্য বিস্তার ও যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলতে হলে দক্ষিণ চীন সাগর তথা তাইওয়ান প্রণালীর ওপর কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করার বিকল্প নেই। দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালীর গুরুত্বের পাশাপাশি প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগকারী মালাক্কা প্রণালী সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রণনীতিগত অবস্থান এখন আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামগ্রিকভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ চীনকে রুখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারই ধারাবাহিকতায় চীনকে রুখতে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত উপর্যুপরি নানা পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। তাই জাতীয় ক্ষেত্রে এ সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও রণনীতিগত সামগ্রিক গুরুত্বের প্রেক্ষিতে এ দেশকে মার্কিনের পক্ষে যুদ্ধে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে এ দেশে তাদের ঘাঁটি ও সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার পরিকল্পনায় জাতিসংঘের মানবিক করিডোর ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরসহ অন্যান্য বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্তমূলক পদক্ষেপ।
বাংলাদেশের সকল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তি, সংগঠন, ব্যক্তিসহ সচেতন শান্তিকামী শক্তি ও অংশকে দেশের নিষ্পেষিত কোটি কোটি শ্রমিক-কৃষক-জনগণের মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত হয়ে স্থায়ী শান্তির জন্য এগিয়ে আসা জরুরি কর্তব্য। সেই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালালদের উচ্ছেদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক-জনগণের সরকার তথা জাতীয় গণতান্ত্রিক সরকার।


