নিজস্ব প্রতিনিধিঃ আন্তর্জাতিক গৃহকর্মী দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ‘‘গৃহশ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে শ্রম আইনে পূর্ণ অন্তর্ভুক্তি এবং গৃহশ্রমিকদের জন্য শোভন কাজ সংক্রান্ত আইএলও কনভেনশন-১৮৯ দ্রুত অনুসমর্থন কর’’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের উদ্যোগে আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন এবং পরবর্তীতে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে একটি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধন ও সভায় গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কভুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, গৃহশ্রমিক প্রতিনিধি, নেটওয়ার্কভুক্ত জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, মানবাধিকার সংগঠন, নারী অধিকার সংগঠন, শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত গৃহশ্রমিকরা অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা গৃহশ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে পূর্ণাঙ্গ আইনগত স্বীকৃতি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
সভায় বক্তব্য রাখেন গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসাইন, বিলস-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ, গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব এবং বিলস পরিচালক নাজমা ইয়াসমীন, স্কপ-এর যুগ্ম-সমন্বয়কারী এএসএম ফয়েজ হোসেন এবং গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কভুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও সভায় বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শামীম আরা, বিলস উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য নইমুল আহসান জুয়েল এবং গৃহশ্রমিক প্রতিনিধিবৃন্দ।

গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী আবুল হোসাইন বলেন, গৃহশ্রমিকদের শ্রম আইনের আওতায় এনে তাদের মৌলিক শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তাদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা এবং সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে নারী গৃহশ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষা, কল্যাণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি।
বক্তব্যে বিলস-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, গৃহশ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় বিধিমালা ও কার্যকর আইনি সুরক্ষার অভাবে তারা এখনো ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে শিশু গৃহশ্রমিকরা নানা ধরনের নির্যাতন ও শোষণের শিকার হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচার নিশ্চিত হয় না। তিনি গৃহশ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা, নির্যাতনের বিচার এবং প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়নের দাবি জানান। এছাড়া গৃহশ্রমিকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সম্মানজনক আচরণ ও ইতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরও বলেন, গৃহশ্রমিকদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করতে তাদের ‘বুয়া’ বলে সম্বোধন না করে নিজ নিজ নাম ধরে ডাকতে হবে। সমাজে তাদের মর্যাদা ও সম্মান প্রতিষ্ঠায় সবার দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন।
বিলস উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য নইমুল আহসান জুয়েল তার বক্তব্যে বলেন, গৃহশ্রমিকদের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে তাদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড এবং তাদের শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করা জরুরি। এতে গৃহশ্রমিকরা সন্তানদের নিরাপদে রেখে নিশ্চিন্তে কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এ লক্ষ্যে তিনি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব এবং বিলস পরিচালক নাজমা ইয়াসমীন বলেন, দেশের গৃহশ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অভিবাসী গৃহশ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, গৃহশ্রমিকদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, যাতে তারা শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন।
বক্তারা উল্লেখ করেন, গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের দীর্ঘ আন্দোলন, প্রচারণা ও অ্যাডভোকেসির ফলে ২০১৫ সালে সরকার ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫’ প্রণয়ন করে। সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের শ্রম আইন সংশোধনীতে গৃহশ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হলেও এতে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতির পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে গৃহশ্রমিকদের অধিকার, সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য আরও কার্যকর আইনগত সংস্কার প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, দেশের লাখো গৃহশ্রমিক এখনো দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম মজুরি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং আইনি সুরক্ষার অভাবের মধ্যে কাজ করছেন। গৃহশ্রমিকদের অধিকাংশই নারী ও শিশু হওয়ায় তারা বহুমাত্রিক বৈষম্য ও ঝুঁকির সম্মুখীন হন। অথচ পরিবার, সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান যথাযথ স্বীকৃতি পায় না।
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, গৃহশ্রমিকদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সরকার, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রম আইনে গৃহশ্রমিকদের পূর্ণ অন্তর্ভুক্তি এবং আইএলও কনভেনশন-১৮৯ অনুসমর্থনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুযায়ী তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তারা গৃহশ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আরও বেগবান করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ২০১১ সালের ১৬ জুন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কনভেনশন-১৮৯ গ্রহণের মাধ্যমে গৃহকর্মকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কাজ এবং গৃহকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে ঐতিহাসিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেই অর্জনের স্মরণে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ১৬ জুন আন্তর্জাতিক গৃহকর্মী দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশেও গৃহশ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন পরিচালিত হয়ে আসছে।
এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল গৃহশ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি, শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্তি, বিধিমালা প্রণয়ণ ও যথাযথ বাস্তবায়ন নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক সুরক্ষার দাবিকে আরও জোরালো করা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুযায়ী গৃহশ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা।

