নিজস্ব প্রতিনিধি ঃ
আজ ২১ এপ্রিল ২০২৬ বিকাল ৩:১৫ টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে সিরডাপ মিলনায়তনে ‘নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ:নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ণের অভিমুখী বাজেট’ বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। প্রারম্ভিক বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। বিশেষ অতিথি হিসেব উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, ড. সেলিম জাহান এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. সাদিয়া শারমিন।
সম্মানিত আলোচক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নিলোর্মী, বিআইডিএস এর গবেষণা পরিচালক (জিইডি) ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. অতনু রাব্বানি, বিআইডিএস এর সিনিয়র রেসার্চ ফেলো ড. আজরীন করিম, দ্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বাংলাদেশ এর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট সাবিনা পারভীন, সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট প্রীতিলতা খন্দকার হক ও সানেমের ডেপুটি ডিরেক্টর ইশরাত শারমিন।
আলোচনা শেষে মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি শাহিদা পারভীন শিখা; শক্তি ফাউন্ডেশনের তাহমিনা ইয়াসমিন, একশন এইড বাংলাদেশ এর মরিয়ম নেছা, ওয়াইডব্লিউ সিএ অব বাংলাদেশ এর মৌসুমী, এডাবের সমাপিকা হালদার, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বহ্নিশিখাদাশপুরকায়স্থ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহান বলেন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে তিনটি দিকের উপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন কেউ আসলে কাউকে ক্ষমতায়িত করতে পারেনা। সেখানে পরিবার, সমাজ ওরাষ্ট্র অন্যরা ক্ষমতায়নের সহযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে; ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বড় কথা হলো গুরুত্বপূর্ণবিষয়গুলো প্রভাবিত, পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করার স্বাধীনতা থাকতে হবে; অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়নকে থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যাবেনা। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য কর্মনিয়োজন, আর্থিক অর্ন্তভূক্তি, তথ্য ও প্রযুক্তিতে সমান অধিকার, সম্পদে অধিকারে থাকা ঘাটতিগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে; সম্পদের উপর নারীর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণে নারীর স্বাধীনতা থাকতে হবে; অসমতার কথা ব্যষ্টিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে; নিরাপত্তার ক্ষেত্রে-ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সহিংসতা থেকে নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চিত ব্যতীত নারীর প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবেনা। বাজেট বাস্তবায়নে
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. সাদিয়া শারমিন বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলতে গেলে সর্বপ্রথম সামনে আসে চ্যালেঞ্জ কি কি আছে তারপর আসে কিভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে শ্রমবাজারে সমসুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত, সেক্টর ভিত্তিক উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে; ৫৬ বছর ধরে চলমান সমস্যা নিরসেন বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কমিউনিটি ভিত্তিক মনিটরিং হতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীর বাস্তব প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে; তবে উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব নির্ধারণে সচেতনতা তৈরিতে ডাটা নিয়ে কাজ করতে হবে; নারীকে আরো কি ধরণের সুবিধা প্রদান করলে অগ্রগতি তরান্বিত হবে সেবিষয়গুলো গবেষণামাধ্যমে চিহ্নিত করার উপর গুরুত্ব দিতে হবে; বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন গোষ্ঠীর নারীদের দিকটি বিবেচনায় রাখতে হবে
সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত সম্মানিত আলোচক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নিলোর্মী, বিআইডিএস এর গবেষণা পরিচালক (জিইডি) ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. অতনু রাব্বানি, বিআইডিএস এর সিনিয়র রেসার্চ ফেলো ড. আজরীন করিম, দ্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বাংলাদেশ এর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট সাবিনা পারভীন, সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট প্রীতিলতা খন্দকার হক ও সানেমের ডেপুটি ডিরেক্টর ইশরাত শারমিন।
আলোচকবৃন্দ বলেন
জেন্ডার বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে জেন্ডার ইস্যূ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণার উপর গুরুত্ব দিতে হবে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক জেন্ডার বাজেটের মাধ্যমে মানব উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দেয়। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য তাকে দেওয়া সহায়তার উপকরণ কতটা কাজে লাগলো, অর্থ নারীর হাতে পৌঁছায় কিনা তা ফলাফল ভিত্তিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চশিক্ষায় ও উচ্চবেতনের কাজে নারীর অর্ন্তভূক্তি বৃদ্ধি করতে হবে; মানব উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে বিনিয়োগের ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে হবে, নিরাপদ ও অর্ন্তভ’ক্তিমূলক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতাকে চিহ্নিত করতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যূকে ও গুরুত্ব দিতে হবে, এটা নারী ও পুরুষের উপর ভিন্ন প্রতিঘাত তৈরি করে। উন্নয়নের প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। উন্নয়ন নিশ্চিতে মানুষের নেতিবাচক আচরণ বদলাতে উৎপাদনমুখী শিক্ষায় বরাদ্দবৃদ্দি করতে হবে, জেন্ডার ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টকরতে হবে। আমাদের পরিকল্পনায় প্রক্রিয়া জেন্ডার টার্গেটেড হতে হবে, জেন্ডার বাজেট ট্রাকিং করা হলে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে; সরকারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নের দিকে মনোযোগ আছে কিনা এটি দেখতে হবে; অভিবাসীদের দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে গুরুত ¡দিতে হবে, ঘাটতির দিকটাকে সমন্বয় করে বৃহত্তর বিনিয়োগে গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিনটি দিকে গুরুত্ব দিতে হবে- আয় স্থিতিশীল, ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা এবং সংকট নিরসনে সহায়তা। জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুসারে অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন এখনো পিছিয়ে। জেন্ডার বাজেট শুধু ঝুঁকি কমানোর জন্য নয় বরং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য হতে হবে। সমাজ এখন তৈরি না এমন হলে- আমাদের সমাজ তৈরির দিকেই গুরুত্ব দিতে হবে। চাকুরির বাজার নিয়ে কাজ করতে হবে। পুরো বাজেটে নারীদের কতটুকু গুরুত্ব থাকে তার পরিমাপ করতে হবে। বরাদ্দকৃত বাজেটে বরাদ্দকৃত খাতের খরচ মনিটরিং করতে হবে, অপারেটিং স্পেন্ড বেড়েছে, উন্নয়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ কমেছে, এসব দিক ট্রাকিং করা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বিনিয়োগ বহুমুখী হয়েছে, কেয়ার ইকোনমি ও বর্তমানে অর্থনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। জেন্ডার বাজেট বরাদ্দের সময় এসকল দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, জেন্ডার বাজেট নিয়ে এলডিসি উত্তরণের নানা প্রতিক’লতার মধ্যেও নারী অগ্রসরমান্ । নারী সমাজের দিকে তাকালে আমরা দেখি প্রান্তিক নারী, যিনি স্বামী পরিত্যক্তা হলেও নিজস্ব পরিচিতি কে তুলে ধরতে ক্রমাগত সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অর্থনৈতিক স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিতে নারীর যুক্ততা ৬০% এটা তরান্বিত করতে হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নে নারীকে কে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিক’ল পরিবেশে নারী এককভাবে যেন পিছিয়ে না যায় সেটি আমাদের দেখতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসন যেকোন ক্ষমতায়নের জন্য জরুরী। সহিংসতা নিরসনে সেবাখাত যেমন ওসিসি সেন্টারের কার্যক্রম প্রজেক্ট শেষ হলেও চালু রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি এসময়। এটি বন্ধ হলে নারীর প্রতি সহিংসতার যে দূর্বৃত্তায়নের কথা বলে হচেছ তা বৃদ্ধি পাবে কিনা আমাদের দেখতে হবে। নারীর সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকার আইনের দিকটি নির্দেশনা বাজেটের মাধ্যমে আসতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মূল কেন্দ্রে থাকা নারী-পুরুষের ভারসাম্যের সমতাপ্রতিষ্ঠায় কাজ করার জন্য সকলকে আহ্বান জানান।
প্রারম্ভিক বক্তব্যে সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, গত ৫৬ বছর ধরে এই সংগঠন জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে । পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে সমতা প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজন নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করা। সমগ্র বিশ^জুড়ে বর্তমানে সৃষ্ট বিশৃংখল অবস্থায় মানবাধিকার ভুলুণ্ঠিত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে নারীর উপরে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বৈষম্যের শিকার ও পিছিয়ে পড়া নারীর জন্য নিরাপত্তা তৈরি করে । শ্রমবাজারে নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমে আসছে বিভিন্ন বৈশি^ক কারণে। তিনি এসময় নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় বাধা হিসেবে উৎপাদনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার অভাব, কাজ অনুসারে যথাযত দক্ষতার অভাব, নারীর অবাধ চলাচলে বাধা, শ্রম বাজারে নারীর উপার্জন গৌণ উপার্জন হিসেবে অভিহিত হওয়ায় সামাজিক মর্যাদা অভাব, প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব, স্বল্প মজুরিতে নারীর বিনিয়োগ, সম্পদের অপ্রতুলতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনার নিজের সম্পদ ও উপার্জনের নিজের অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ না থাকা, অনানুষ্ঠানিক গৃহ শ্রম এবং বাল্যবিয়ের কারণসমূহ উল্লেখ করেন। তিনি এসময় বলেন এত বাধার পরও নিজের জীবনের মান উন্নয়নের জন্য, জীবিকার তাগিদে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণের আগ্রহ আছে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে আসন্ন বাজেটে নারীর অবস্থার উন্নয়নের জন্য শিক্ষণাকে উৎপাদনমূখী করে তুলতে হবে, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, দক্ষতায় বিনিয়োগ, গৃহস্থালি কাজের পুন:বন্টন, নারীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ মজুরী ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত এবং নির্ধারিত কর্মঘন্টা দেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
উক্ত গোল টেবিল বৈঠকে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সংগঠনের মধ্যে একশন এইড, শক্তি ফাউন্ডেশন, ব্লাষ্ট, ঢাকা ওয়াইডব্লিউ সিএ অব বাংলাদেশ; বাংলাদেশ ট্রেডইউনিয়ন সেন্টার, নারী মৈত্রী, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ এবং এডাব এর প্রতিনিধিবৃন্দ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেত্রীবৃন্দ, সম্পাদকমন্ডলী, কর্মকর্তা, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক সহ প্রায় ১৩০জন উপস্থিত ছিলেন।
সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আন্দোলন উপপরিষদ সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি

