আজাদুর রহমান বশির,ঢাকা।
আনোয়ারা উদ্যান—নামটি আশার, বাস্তবতা হতাশার। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেট, তেজগাঁও কলেজ-এর সামনে অবস্থিত এই স্থানটি হতে পারত শহরের প্রাণকেন্দ্রের এক টুকরো সবুজ আশ্রয়। যেখানে শিশুরা খেলত, মানুষ হাঁটত, ক্লান্ত নগরজীবন কিছুটা স্বস্তি পেত—সেই জায়গা আজ লোহার গ্রিল আর নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে বন্দি।
পাশেই ছুটে চলছে ঢাকা মেট্রো রেল—উন্নয়নের প্রতীক। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, উন্নয়ন কি শুধুই অবকাঠামো আর গতির নাম? নাকি উন্নয়ন মানে মানুষের বেঁচে থাকার পরিবেশ নিশ্চিত করা?
মেট্রোরেল নির্মাণের সময় এই জমি ব্যবহৃত হয়েছে—যা ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পরও কেন সেই জমি মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলো না? কেন একটি সম্ভাবনাময় উদ্যান এখনো প্রশাসনিক দ্বন্দ্বে আটকে?
একদিকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়—দখল ও নিয়ন্ত্রণের ভাষা।অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন—মানুষ ও প্রকৃতির পক্ষে দাঁড়ানো একটি মানবিক উদ্যোগ।
এই দ্বন্দ্ব শুধু জমির নয়—এটি রাষ্ট্রের দর্শনের প্রশ্ন। রাষ্ট্র কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ কাগজের মালিকানার জন্য?
আজকের শহরে শিশুর খেলার মাঠ নেই, বৃদ্ধের বসার জায়গা নেই, মানুষের প্রকৃতির কাছে ফেরার পথ নেই।এই উদ্যান হতে পারত সেই মুক্তির দরজা—কিন্তু তা আজও বন্ধ।
এই ইস্যু এখন আর স্থানীয় নয়—এটি জাতীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। এখানে দৃষ্টি দিতে হবে নীতিনির্ধারকদের, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষকে, নগর পরিকল্পনাবিদদের, পরিবেশ বিশ্লেষকদের। যারা রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের সাথে জড়িত—তাদের কাছে এটি একটি বাস্তব পরীক্ষা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও এই বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী-সহ জাতীয় নেতৃত্বের কাছে প্রশ্ন—
মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক কি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে,
নাকি বাস্তবে তা প্রতিফলিত হবে?
একটি উদ্যান মানে শুধু গাছ নয়—
এটি একটি শহরের ফুসফুস,
একটি প্রজন্মের মানসিক সুস্থতার ভিত্তি,
এটি মানবিক সভ্যতার প্রতীক।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এই স্থানকে উন্মুক্ত উদ্যান হিসেবে গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নিয়েছে—তা কেবল একটি প্রকল্প নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজন আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, সুস্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।
আজ সিদ্ধান্তের সময়—
আমরা কি শুধু কংক্রিটের শহর গড়বো,
নাকি একটি জীবন্ত, শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া শহর গড়বো?
এই উদ্যান যদি ফিরে পায় তার প্রকৃত রূপ,
তবে সেটি শুধু একটি পার্ক হবে না—
এটি হবে রাষ্ট্রের একটি ঘোষণা:
“মানুষ ও প্রকৃতি একসাথে বাঁচবে।”
আর যদি না হয়—
তবে এই লোহার গ্রিলগুলোই একদিন সাক্ষ্য দেবে,
কিভাবে রাজধানীর হৃদয়ে দাঁড়িয়েই
একটি শহর নিজের শ্বাসরুদ্ধ করেছে।


