রুপসীবাংলা ৭১ঃ ইরান যুদ্ধ জয়ের চেষ্টা করছে না, টিকে থাকার চেষ্টা করছে, লক্ষ্য দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে সরকার বদলের মধ্য দিয়ে বিজয় ঘোষণায় আগ্রহী। যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বের যুদ্ধ-বিশারদদের নানা মুনির নানা মত। তবে সবাই একটি বিষয়ে একমত যে, ইরান সহজে মাথা নোয়াবে না? তাহলে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ইরানকে ‘গাজা’ বানিয়ে দেবে। যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানের শীর্ষ নেতা আলী খামেনী সহ সর্বস্তরের ৫০জন উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে একসাথে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে। এদের ধারণা ছিলো, শীর্ষ নেতৃত্ব না থাকলে ইরান ভেঙ্গে পড়বে। হটাৎ আঘাতে ইরান হকচকিয়ে যায়, কিন্তু পাল্টা আক্রমন চালায়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবগুলো মিত্রদেশ, ইসরাইল ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ইরান ৬জন মার্কিন সৈন্য হত্যা করে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমান বিশাল। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। ইরান মুখ্যত সবক’টি দেশে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করতে উদ্যত।
এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বল্পকালীন লক্ষ্য ইরানে মোল্লাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে নুতুন সরকার গঠন করা। যদিও এদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হচ্ছে ইরানকে অন্তত: ৪টি দেশে বিভক্ত করা। ইরান মোটামুটি ৪ ধরণের মানুষের বসতি। কুর্দী, আজারবাইজান, পার্সী ও বেলুচ। এরমধ্যে পার্সীরা প্রায় ৫৫-৬০%, এরপর আছে কুর্দিরা। এ প্ল্যান সফল হলে ইরানে শুধু সরকার বদল হবে তা নয়, ইরান মোল্লাতন্ত্র থেকে বের হয়ে পারস্য সভ্যতায় ফিরে যাবে। ইরানের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক তরুণ, এঁরা মোল্লাতন্ত্র থেকে বের হতে চায়, এদের বেশিদিন আটকে রাখা যাবেনা। ধ্বংস্তুপের মধ্যে দাঁড়িয়েও ইরান যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। যদিও মাত্র ৫-৬ দিনের মাথায় ইরান প্রায় শেষ, এর নেভি শেষ, এয়ারফোর্স, রাডার ও এয়ার ডিফেন্স ধ্বংশ, তবু ইরান মাঝেমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ছুড়ছে। ইরান জানাচ্ছে, সরকার ঠিকঠাক চলছে। ইরানে মৃতের সংখ্যা সহস্রাধিক। যুদ্ধে ইরানের টিকে থাকা ছাড়া তেমন অর্জন নেই!
ইরানের আকাশ ইসরাইল ও আমেরিকার জন্যে মুক্ত, ফলে বুধবার তেহরানের আকাশেই ইরানি বিমান ভূপাতিত করে ইসরাইল। ইরানের আকাশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দখলে থাকলেও মাটি ইরানের দখলে। স্থলযুদ্ধ হবার সম্ভবনা কম। প্রক্সি যুদ্ধ বিস্তার লাভ করছে। ইরাক থেকে কুর্দীরা ইরানে ঢুকছে, কুর্দিরা ইরানে আক্রমন শুরু করেছে। হেজবুল্লাহ ইসরাইলে আক্রমন চালাচ্ছে। ইরান এর স্লিপিং সেল জাগ্রত করছে। কেন এ যুদ্ধ? ট্রাম্প ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ করতে চাচ্ছেন। ভেনিজুয়েলার পর তিনি ইরানে সহজ বিজয় চাচ্ছিলেন। চীনকে অর্থনৈতিকভাবে ঠেকানো এযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য। ইরান আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে এলে চীন বিপাকে পড়বে। এছাড়া ইসরাইল-ইরান একে অপরের চিরশত্রু। ইসরাইল জানে ইরান পারমাণবিক শক্তি হলে ইসরালের অস্তিত্ব থাকবে না? সুতরাং ইরানকে ঠেকাতেই হবে। এমন তো হতে পারে এই যুদ্ধে ইরান ও ইসরাইল দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং ফলশ্রুতিতে মধ্যপ্রাচ্যে কিছুটা শান্তি ফিরে আসতে পারে, হয়তো স্বাধীন প্যালেষ্টাইন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটবে।
আমেরিকার ভেতরে যুদ্ধের বিপক্ষে চাপ আছে। সামনের নভেম্বরে ‘মিডটার্ম নির্বাচন’। ট্রাম্প এযুদ্ধে জিতে দলকে এগিয়ে নিতে চাচ্ছেন। ট্রাম্প কি ইরানে বড় ধরণের কোন আঘাত হানবেন? খবর বেরিয়েছে যে, চীন ইরানকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। চীন বলেছে, না, আমরা দিচ্ছিনা। রাশিয়া ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে হামলা বন্ধ করতে বলেছে। আসলে রাশিয়া-চীন তলে তলে ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে। ভারত ও স্পেন ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। ইংল্যান্ড আগেই ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, তবে যুদ্ধে জড়াবে না বলে দিয়েছে। ইরান ইতোমধ্যে সাইপ্রাসে বৃটেনের সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন আক্রমন চালিয়েছে। সাবেক ফরেন সেক্রেটারি কন্ডোলিসা রাইস ইরান সমস্যা চিরতরে সমাধানের জন্যে ট্রাম্পের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। রেজা পাহলভী ইরানি কর্মকর্তাদের ‘অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তর’-এর আহবান জানিয়েছেন। ট্রাম্প ইরানের পরবর্তী সরকার নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।
আমেরিকার ৫০টি স্টেটের পাদ্রীরা হোয়াইট হাউসে সমবেত হয়ে ট্রাম্পের বিজয়ের জন্য প্রার্থনা সভায় মিলিত হন। ইরান হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ইসরাইলের জাহাজ চলাচল বন্ধ করেছে, তবে ভারত ও অন্যান্য দেশের জন্যে উন্মুক্ত আছে। মার্কিন কংগ্রেসে ‘ওয়ার পাওয়ার রেজুলেশন’ পাশ হয়নি, ফলে ট্রাম্প যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু কতদিন? ইরান কতদিন টিকে থাকতে পারবে? বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু মিডিয়া এবং জনগণের একটি অংশ এখনো ইরানকে জিতিয়ে দিচ্ছে। যাঁরা বিশ্ব যুদ্ধের আশংকা প্রকাশ করছিলেন তাদের জন্যে দু:সংবাদ যে, যুদ্ধ বিস্তৃত হচ্ছেনা, বরং যেকোন সময় থেমে যাবে। আমেরিকা ও ইসরাইল ইচ্ছেমত যুদ্ধ থামাবে। আর যুদ্ধ কোথায়? এতো ক্ষমতার হাতবদলের নুতন সামরিক তরিকা। যারা ভাবছেন ক্ষমতার হাতবদল হচ্ছনা, তারা নিশ্চিত থাকুন, তা না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ থামছে না? ইরানের ভেতরের মানুষ প্রকৃত খবর পাচ্ছনা, তারা শুধু মোল্লাতন্ত্রের লম্ফঝম্ফ শুনছে। যেদিন তারা আসল সংবাদ জানবে তখন তারা রাস্তায় নেমে আসবে।
পূর্ববর্তী খবর: যুদ্ধ কোথায়! যুদ্ধ তো দেখছি না, দেখছি খামেনীতন্ত্র পরিবর্তনের চেষ্টা। এলক্ষ্যে প্রথমেই খামেনি’র বাসভবনে প্রচন্ড আক্রমন। একবাড়ীতে ৭টি মিসাইল ছোড়া হয়? এতে খামেনির মৃত্যু ঘটে। সাথে যুদ্ধমন্ত্রী এবং আরো বেশকিছু সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তার মৃত্যু। ট্রাম্প বলেছেন, ৪৯জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হয়েছে। ইসরাইল প্রথমে খামেনি’র মৃত্যু সংবাদ দেয়, ইরান অস্বীকার করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক’ঘন্টা পরে খামেনি’র মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত করে। ইরান মেনে নেয় এবং ৪০দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে! ইরান বলেছে অস্থায়ী মোল্লা পরিষদ কাজ করছে, এবং শিগগিরই খামেনি’র উত্তরসূরি ঘোষণা করা হবে। খামেনির মৃত্যু’র পর অন্তর্বর্তী সুপ্রিম লিডার হিসাবে আয়াতুল্লাহ আরাফি দায়িত্ব গ্রহণ করেন, শোনা যায় ইসরাইলী বিমান আক্রমণে তিনিও নিহত হয়েছেন। খামেনির স্ত্রীও নিহত হয়েছেন। ইরান গুজব ছড়িয়েছিলো যে তারা সফলভাবে তেলআবিবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, এবং নেত্তনাহু’র হয়তো নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প ইরানি জনগণকে ‘রেজিম চেঞ্জের’ আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটিই একমাত্র এবং হয়তো শেষ সুযোগ। তিনি ইরানি পুলিশ ও গার্ড রেজিমেন্টকে অস্ত্র সমর্পনের পরামর্শ দিয়েছেন, অথবা মৃত্য’র জন্যে প্রস্তুত থাকত হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্প প্রথমে সপ্তাহখানেক বললেও এখন বলছেন যে, ৪-৫ সপ্তাহ যুদ্ধ চলতে পারে। বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানী ও ইউরোপীয় নেতারা ইরানের যত্রতত্র ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণে বিরক্ত হয়ে ইরানের ওপর আঘাত হানার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে, স্পেন ইরানে আক্রমণের নিন্দা করেছে। ইসরাইল বলেছে, ইরানে সরকার বদল আসন্ন। ইরান পাল্টা আক্রমন হিসাবে ইসরাইল ও ৮টি মুসলিম দেশে আক্রমন চালিয়েছে। সৌদি প্রিন্স বলেছেন, ইরান আক্রমন না থামালে তাঁরা আমেরিকার পক্ষে যুদ্ধে নামবেন। ট্রাম্প রোববার ইরানকে যুদ্ধ বিস্তার না করার জন্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। যুদ্ধ কি দীর্ঘস্থায়ী হবে? প্রশ্নই ওঠেনা, যেকোন সময় যুদ্ধ থেমে যাবে।
ইরান কাতারে হামলা করেছে, এতে কিছু বাংলাদেশী উল্লাস প্রকাশ করেছে। কাতার কর্তৃপক্ষ ১৫জন বাংলাদেশির ভিসা বাতিল করেছে। বিদেশমন্ত্রী রজার খলিলুর রহমান বলেছেন, কাতার-কুয়েত-বাহরাইন বাংলাদেশিদের নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছে। ইত্তেফাক জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য হামলায় ২ বাংলাদেশী নিহত, ২জন আহত হয়েছে। বাংলাদেশ বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে খামেনীকে হত্যা করা হয়েছে। যুগান্তর প্রশ্ন করেছে, খামেনীর মৃত্য’র পরও ইরান টিকে আছে, কিন্তু কতক্ষন টিকবে? ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে, ওমানে যা ঘটেছে সেটি সরকারি সিদ্ধান্ত ছিলোনা। সাথে তিনি যোগ দেন যে, রিভ্যুলিউশনারি গার্ড স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ওমানে একটি তেলবাহী জাহাজে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণে ১৫জন ভারতীয় শ্রমিক নিহত হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথার অর্থ হচ্ছে, সরকার ও রিভ্যুলিউশনারি গার্ড প্যারালালভাবে কাজ করছে?
ইরান আক্রমণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে জামাত বিক্ষোভ করেছে, সেখানে বিএনপি’র বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট একশানের শ্লোগান উঠেছে। জামাতের এটিএম এজাহার বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধ না হলে জামাত বৃহত্তর কর্মসূচি দেবে। দেশে বসে এত হুমকি-ধমকি না দিয়ে ইরানে গিয়ে যুদ্ধে জড়ালেই তো হয়? যুদ্ধ হচ্ছে আমেরিকা-ইসরাইল-ইরানের মধ্যে, ঢাকায় শ্লোগান উঠেছে, ‘ইরানে হামলা কেন, দিল্লি জবাব দে’। মোদী ইসরাইল সফর করে ভারতে ফিরে গেলে এ আক্রমন শুরু হয়, মোল্লারা বলছে, ভারত গ্রীন সিগন্যাল দিয়ে এসেছে। অথচ ভারত নেত্তানেহুকে ফোন করে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছে। নিউইয়র্কে রিপাবলিকান নাসির আলী খান একটি সত্য কথা বলেছেন, সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘অধিকাংশ বাংলাদেশী সারাদিন আমেরিকার ধ্বংস কামনা করে, রাতে চিন্তা করে কিভাবে আমেরিকা যাওয়া যায়, হিপোক্রেট’। শফিউর রহমান ফারাবী বলেছেন, খামেনীর মৃত্যু’র পেছনে শিয়াদের ‘মুতা বিয়া’ দায়ী।
খামেনির মৃত্যুতে বিশ্বব্যাপী উল্লাস হয়েছে, কোথাও কোথাও বিক্ষোভ হয়েছে। ইরানীরা গান বাজিয়ে, আতশবাজি ফুটিয়ে উল্লাস করেছে। অথচ বাংলাদেশের মানুষের মন খারাপ। জ্যাকসন হাইট্সে সন্ধ্যায় এত পার্কিং দেখে মনে হলো ট্রাম্প বাংলাদেশিদের মনে দু:খ দিয়েছেন, অথচ ইরানের জনগণ খুশি! খামেনি হত্যার প্রতিবাদে করাচিতে মার্কিন দূতাবাসে হামলা করতে চাইলে পুলিশের গুলিতে ৯জন নিহত হয়েছে। ভারতে ইরানের পক্ষে যত বিক্ষোভ হয়েছে সারাবিশ্বে হয়তো তা হয়নি। যুদ্ধ বন্ধের জন্যে আমেরিকার ভেতরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি চাপ আছে? আমেরিকা আসলে ৪৭ বছর আগেকার ঘটনার প্রতিশোধ নিচ্ছে। ঐসময় ইরান তার দেশে মার্কিন কূটনীতিকদের ৪৪৪দিন আটকে রেখেছিলো। আমেরিকা ছাড় দেয়, ছেড়ে দেয়না। একই কারণে আমেরিকা লিবিয়াকে ধ্বংস করে দিয়েছে।


