রুপসীবাংলা৭১ আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জনসাধারণের চোখের আড়ালে উত্তর সাগরের গভীর তলদেশে এক বিশাল পরিবহন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে নরওয়ে। প্রকল্পটির নাম ‘রগফাস্ট’—একটি সমুদ্রতল সড়কসুড়ঙ্গ, যা দেশটির পশ্চিম উপকূলজুড়ে ফেরিবিহীন নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ হবে।
ইতোমধ্যে কঠিন শিলা কেটে সুড়ঙ্গ খননের কাজ শুরু হয়েছে। পুরো সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য হবে ২৭ কিলোমিটারের বেশি, আর এটি সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৪০০ মিটার নিচে পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে নরওয়ের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল ফেরি পারাপারের প্রয়োজনও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।
এই উচ্চপ্রযুক্তিসম্পন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
সমুদ্রপৃষ্ঠের ৪০০ মিটার নিচে সুড়ঙ্গ
‘রগফাস্ট’ নামটি এসেছে নরওয়েজীয় শব্দ ‘রোগাল্যান্ড ফাস্টফোরবিনডেলসে’ থেকে, যার অর্থ স্থায়ী সংযোগ। এই সড়কসুড়ঙ্গটি র্যান্ডাবার্গ ও বোকন অঞ্চলকে সংযুক্ত করবে এবং উপকূলীয় মহাসড়ক ই৩৯-এর অংশ হবে।
ই৩৯ মহাসড়কটি উত্তরের ত্রোনহাইম থেকে দক্ষিণের ক্রিস্তিয়ানসান্দ পর্যন্ত বিস্তৃত, যার দৈর্ঘ্য এক হাজার ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি। বর্তমানে এই পথে চলাচলের জন্য চালকদের সাতটি ফেরি ব্যবহার করতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সেতু ও সুড়ঙ্গ নির্মাণের মাধ্যমে এসব ফেরি পারাপার বন্ধ করার লক্ষ্য নিয়েছে নরওয়ে সরকার।
বিশ্বের সবচেয়ে গভীর সড়কসুড়ঙ্গ
রগফাস্টের সবচেয়ে গভীর অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৩৯২ মিটার নিচে, যা বর্তমানে বিশ্বে যান চলাচলের জন্য ব্যবহৃত কোনো সমুদ্রতল সুড়ঙ্গের চেয়ে গভীরতম। প্রকৌশলীরা সুড়ঙ্গটির দুই প্রান্ত থেকে একসঙ্গে খননকাজ শুরু করেছেন, যাতে খনন দলগুলো সমুদ্রের নিচে এসে একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়।
লক্ষ্য হচ্ছে, ৫ সেন্টিমিটারের কম ত্রুটিসীমা রেখে খনন অংশগুলোকে সংযুক্ত করা—যা এত বিশাল প্রকল্পে ব্যয় ও ঝুঁকি কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পানির চাপ ও শিলা ফাটল বড় চ্যালেঞ্জ
সমুদ্রপৃষ্ঠের শত শত মিটার নিচে কাজ করার সময় প্রবল পানির চাপ ও শিলার ফাটল বড় প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। লবণাক্ত পানি সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকে পড়া ঠেকাতে বিশেষ গ্রাউটিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
রগফাস্টের উত্তর অংশ নির্মাণ করছে সুইডিশ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান স্কানস্কা। প্রকল্প ব্যবস্থাপক অ্যান ব্রিট মোয়েন সিএনএনকে জানান, খননের সময় পানি ঢুকে যাওয়ার ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটেছে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রাউটিং কৌশল আরও উন্নত করা হচ্ছে।
উত্তর অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯ কিলোমিটার, যেখানে সুড়ঙ্গের সবচেয়ে গভীর অংশগুলো অবস্থিত।
সুড়ঙ্গের নকশা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
রগফাস্ট দুটি পৃথক টিউব নিয়ে নির্মিত হবে। প্রতিটি টিউবে থাকবে দুই লেনের সড়ক। সুড়ঙ্গের মাঝামাঝি অংশে চালকেরা দিক পরিবর্তন বা সংযোগ সুড়ঙ্গে প্রবেশ করতে পারবেন।
প্রায় ২৬০ মিটার নিচে একটি ভূগর্ভস্থ সংযোগস্থল থাকবে, যেখান থেকে একটি শাখা সুড়ঙ্গ নরওয়ের সবচেয়ে ছোট পৌরসভা কভিৎসোয় দ্বীপের দিকে যাবে।
সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকবে উন্নত বায়ুপ্রবাহ ব্যবস্থা, পাশাপাশি দুর্ঘটনা শনাক্ত ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম, ক্যামেরা ও রাডার ব্যবহার করা হবে।
ব্যয় ও অর্থনৈতিক প্রভাব
রগফাস্ট প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কায় ২০১৯ সালে কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও পুনঃপর্যালোচনার পর ২০২১ সালে নির্মাণকাজ আবার শুরু হয়। আশা করা হচ্ছে, ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন হবে।
এই সড়কসুড়ঙ্গ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি নরওয়েজীয় ক্রোনার, যা প্রায় ২৪০ কোটি মার্কিন ডলার।
ফেরি পারাপার বন্ধ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মসংস্থান কমলেও উন্নত সড়ক যোগাযোগের ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোয়েন বলেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা শিল্প, শিক্ষা, জনসেবা এবং সামুদ্রিক খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তার মতে, রগফাস্টের প্রভাব রাতারাতি নয়—ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে দেবে।
রুপসীবাংলা৭১/এআর

