রুপসীবাংলা৭১ অন্যান্য ডেস্ক : ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; বরং এটি একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে জামাআতের সঙ্গে সালাত আদায় ঈমানের জীবন্ত প্রকাশ। বিশেষত ফজর ও ইশার সালাত; এই দুই সময় মানুষের অলসতা, ঘুম ও পার্থিব ব্যস্ততা ঈমানের পরীক্ষায় পরিণত হয়। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দুই সালাতকে মুনাফিকি চিহ্নিত করার একটি মানদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নিচের হাদিসে নবী (সা.) অত্যন্ত দৃঢ় ভাষায় জামাআতের সালাতের গুরুত্ব ও এর প্রতি অবহেলার ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ لَيْسَ صَلاَةٌ أَثْقَلَ عَلَى الْمُنَافِقِينَ مِنَ الْفَجْرِ وَالْعِشَاءِ وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا لَأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا لَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ الْمُؤَذِّنَ فَيُقِيمَ ثُمَّ آمُرَ رَجُلاً يَؤُمُّ النَّاسَ ثُمَّ آخُذَ شُعَلاً مِنْ نَارٍ فَأُحَرِّقَ عَلَى مَنْ لاَ يَخْرُجُ إِلَى الصَّلاَةِ بَعْدُ.
আবু হুরাইরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুনাফিকদের জন্য ফজর ও ‘ইশার সালাত অপেক্ষা অধিক ভারী সালাত আর নেই। এ দুই সালাতের কী ফাজিলাত, তা যদি তারা জানত, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তারা উপস্থিত হতো। (রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন) আমি ইচ্ছে করেছিলাম যে, মুয়ায্যিনকে ইকামাত দিতে বলি এবং কাউকে লোকদের ইমামত করতে বলি, আর আমি নিজে একটি আগুনের মশাল নিয়ে গিয়ে অতঃপর যারা সালাতে আসেনি, তাদের ওপর আগুন ধরিয়ে দিই।
(বুখারি, হাদিস : ৬৫৭)
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুনাফিকদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট করেছেন; তাদের কাছে ফজর ও ইশার সালাত সবচেয়ে ভারী ও কষ্টকর। কারণ এই দুই সালাত এমন সময়ে আদায় করতে হয়, যখন অন্তর সত্যিকার ঈমানে আলোকিত না হলে মানুষের প্রবৃত্তি আলস্য ও আরামের দিকেই ঝুঁকে পড়ে।
১. ফজর ও ইশার সালাত কেন মুনাফিকদের জন্য ভারী?
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘এই দুই সালাত এমন সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যখন মানুষ গোপনে থাকে। কেউ দেখছে; এই অনুভূতি কম থাকে। তাই এখানেই মুনাফিক ও মুমিনের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়।’ (শরহ সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ দিনের অন্য সালাতে মানুষ সামাজিক উপস্থিতির কারণে অংশ নেয়; কিন্তু ফজর ও ইশায় কেবল আল্লাহর প্রতি ঈমানই মানুষকে মসজিদে টেনে আনে।
২. “হামাগুড়ি দিয়ে হলেও আসতো”—এর তাৎপর্য
ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) বলেন, ‘এটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা এই সালাতগুলোর অসীম ফযিলত এবং জামাআতের গুরুত্ব বোঝাতে।’ (ফাতহুল বারী, ২/১৪০) অর্থাৎ প্রকৃত ফযিলত জানা থাকলে শারীরিক কষ্টও বাধা হয়ে দাঁড়াত না।
৩. আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা; বাস্তব না প্রতীকী?
এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইমাম নববী (রহ.) স্পষ্ট করে বলেন, ‘এটি ছিল কঠোর ভর্ৎসনা ও ভয় প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বলা; বাস্তবে তা কার্যকর করা হয়নি।’ (শরহ সহিহ মুসলিম)
ইমাম কুরতুবী (রহ.) আরও বলেন, ‘যেহেতু ঘরে নারী ও শিশু থাকতে পারে, তাই বাস্তব শাস্তি প্রয়োগ করা হয়নি; তবে এটি জামাআতের সালাত ছেড়ে দেওয়ার গুরুতর অপরাধ নির্দেশ করে।’ (আল-মুফহিম লিমা আশকালা মিন তালখিস মুসলিম)
এই হাদিসের আলোকে বহু আলেম মত দিয়েছেন যে, পুরুষদের জন্য জামাআতের সঙ্গে সালাত আদায় ওয়াজিব বা ওয়াজিবের নিকটবর্তী সুন্নাতে মুআক্কাদা। ইমাম আহমদ (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ওজর ছাড়া জামাআত ছেড়ে দেয়, তার ঈমান নিয়ে শঙ্কা করা হয়।’ ( আল-মুগনি, ইবনু কুদামাহ)
এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ফজর ও ইশার সালাত কেবল সময়ভিত্তিক ইবাদত নয়; বরং এগুলো ঈমানের সত্যতা যাচাইয়ের আয়না। জামাআতের সঙ্গে এই দুই সালাত আদায় করা অন্তরের ইখলাস ও আল্লাহভীতির প্রমাণ। আর অবহেলা করা মুনাফিকির দিকে ধাবিত হওয়ার এক ভয়ংকর লক্ষণ।
রুপসীবাংলা৭১/এআর

